ঢাকা, সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ আপডেট : ৩ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১২ মে ২০২১, ১০:০৮

প্রিন্ট

মুসলমানদের জীবনে ঈদের তাৎপর্য

মুসলমানদের জীবনে ঈদের তাৎপর্য
প্রতীকী ছবি

মো. আফছার আলী খান

ঈদ বিশ্ব মুসলিম মননে এ অনন্য আনন্দ উৎসব হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। হজরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, ‘সব জাতিরই আনন্দ-উৎসব আছে, আমাদের আনন্দ-উৎসব হচ্ছে ঈদ।’ ঈদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম ঈদ পালিত হয় দ্বিতীয় হিজরির ১ শাওয়াল মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ মদিনা মনোয়ারায়, আর মক্কা মোকাররমায় প্রথম ঈদ পালিত হয় অষ্টম হিজরি মোতাবেক ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের প্রায় ১১ দিন পর। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামের প্রচার শুরু হয় ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ।

বাংলাদেশে কোথায় যে ঈদের সালাত প্রথম কায়েম হয়েছিলো তা জানা যায় না। তবে ধারণা করা যায়, সন্দীপ অঞ্চলে প্রথম ঈদের জামাত হয়েছিলো। ঢাকায় প্রথম ঈদ উদযাপিত হয় সুলতানি আমলে।

নামকরণ: ঈদ শব্দটি আরবি। অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি। শব্দের মূল রূপ হলো আওদ, যার অর্থ ফিরে আসা। লিসানুল আরব অভিধানে রয়েছে, আরবদের কাছে ঈদ বলা হয় এমন সময়কে, যে সময় আনন্দ ও দুঃখ ফিরে আসে। অভিধানে বলা হয়েছে, ঈদকে এ জন্য ঈদ বলা হয় যে তা প্রতি বছর নতুন আনন্দ ও খুশি নিয়ে ফিরে আসে।

কুরআন মাজিদেও ঈদ শব্দের ব্যবহার রয়েছে; ঈসা আ .বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন, তা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য হবে ঈদ-আনন্দোৎসব এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন’ (সূরা মায়িদা-১১৪)। এই আয়াতে আসমানি খাদ্য নাজিল হওয়ার দিনটি পরবর্তীদের জন্য স্মৃতিচারণার দিন হওয়ায় তাকে ঈদ বলা হয়েছে।

ঈদের প্রবর্তন: মহানবী সা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ঈদের প্রবর্তন হয়। রাসূলুল্লাহ সা. মদিনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিরা শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ উৎসব এবং বসন্তের পূর্ণিমায় মেহেরজান উৎসব উদযাপন করছে। তারা এ উৎসবে নানা আয়োজন, আচার-অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন আনন্দ উৎসব করে থাকে। মহানবী সা. মুসলমানদের এ দু’টি উৎসব পালন করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ তোমাদের ওই উৎসবের বিনিময়ে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো পবিত্র দু’টি দিন দান করেছেন। এতে তোমরা পবিত্রতার সাথে উৎসব পালন করো।’

হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, মহানবী সা. যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তাদের দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা উৎসব পালন করত। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এ দু’টি কিসের দিন? তারা বলল, আমরা জাহেলি যুগে এ দুই দিন খেলাধুলা ইত্যাদি উৎসব পালন করতাম। এ নিয়মই চলে আসছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দু’টির পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা (সুনানে আবু দাউদ-১১৩৬, মুসনাদে আহমাদ-১৩৬৪৭)।

উপমহাদেশে ঈদ: ১৩০০-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোটামুটি ২০০ বছরের বেশি সময়ে নগরকেন্দ্রিক ঈদ উৎসবের কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায়। গৌড় পাণ্ডুয়া, সোনারগাঁও কেন্দ্রিক রাজধানী শহরগুলোতে তৎকালীন সুলতানদের নির্মিত মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। ঈদ উপলক্ষে সুলতান, আমির, ওমরাহদের উদ্যোগে ঈদের বর্ণাঢ্য মিছিল হতো।

সুলতানদের উদ্যোগে মসজিদ আঙিনায় নামাজ শেষে ঈদের খাবার দাবার বিতরণের প্রচলন ছিলো। কখনো বা জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড রোদে আমবাগানের ভেতরে, প্রশস্ত জায়গায় বা দীঘির তীরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। প্রাসাদের আঙিনায় খোলা চত্বরেও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। রাজধানীতে ঈদ কেন্দ্রিক নাগরিক বিনোদন কেমন ছিলো তাও জানার খুব বেশি উপায় নেই।

বাংলায় ঈদ: এই যে ঈদ, এই উৎসবের কিভাবে উদ্ভব হয়েছে তার ইতিহাস ও তথ্য সঠিকভাবে আজো জানা যায়নি। নানা ইতিহাস গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক সূত্র ও তথ্য থেকে বাংলাদেশে রোজা পালন এবং ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা উদযাপনের যে ইতিহাস জানা যায় তাতে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও এ দেশে নামাজ, রোজা ও ঈদোৎসবের প্রচলন হয়েছে তার বেশ আগে থেকেই। বঙ্গদেশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম অধিকারে আসার বহু আগে থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলিম সুফি, দরবেশ ও সাধকরা ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে উত্তর ভারত হয়ে পূর্ববাংলায় আসেন। অন্য দিকে আরবীয় এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের বণিকরা চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমেও বাংলার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এভাবেই একটি মুসলিম সাংস্কৃতিক তথা ধর্মীয় প্রভাব পূর্ববাংলায় পড়েছিলো।

এ বিষয়ে নানা ইতিহাস গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে আরো দেখা যায়, অষ্টম শতকের দিকেই বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ফলে, এই সুফি, দরবেশ এবং তুর্ক-আরব বণিকদের মাধ্যমে বর্তমান বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে সে যুগে তা ছিল বহিরাগত ধর্মসাধক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের ধর্মীয় কৃত্য ও উৎসব।

এ দেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় তাসকিরাতুল সোলহা নামক গ্রন্থে। এ গ্রন্থে দেখা যায় আরবের জনৈক শেখউল খিদা হিজরি ৩৪১ সন মোতাবেক ৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় আসেন। বঙ্গদেশে ইসলাম আগমন পূর্বকালে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা এবং বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে আস্তানা গেড়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেন বলে জানা যায়। তবে এদের প্রভাবে পূর্ব বাংলায় রোজা, নামাজ ও ঈদ প্রচলিত হয়েছিল, তা বলা সমীচীন নয়। এরা ব্যক্তিগত জীবনে ওইসব ইসলাম ধর্মীয় কৃত্য ও উৎসব পালন করতেন এ কথা বলাই সঙ্গত। কারণ বাংলাদেশে ‘নামাজ’, ‘রোজা’ বা ‘খোদা হাফেজ’ শব্দের ব্যাপক প্রচলনে বোঝা যায়, আরবীয়রা নয়, ইরানিরাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কারণ শব্দগুলো আরবি ভাষার নয়, ফার্সি ভাষার।

ঢাকার ইতিহাসবিদ হাকিম হাবীবুর রহমান বলেছেন, ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহসুজার নির্দেশে তার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন। এর দৈর্ঘ্য ছিল ২৪৫ ফুট ও প্রস্থ ১৩৭ ফুট। নির্মাণকালে ঈগদাহটি ভূমি থেকে ১২ ফুট উঁচু করা হয়। ঈদগাহের পশ্চিম দিকে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে সেখানে মেহরাব ও মিনার নির্মাণ করা হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উম্মতে মোহাম্মদিকে সম্মানিত করে তাদের এ দুটি ঈদ দান করেছেন। আর এ দুটি দিন বিশ্বে যত উৎসবের দিন ও শ্রেষ্ঠ দিন রয়েছে তার সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন ও সেরা ঈদ। ইসলামের এ দুটো উৎসবের দিন শুধু আনন্দ-ফুর্তির দিন নয়। বরং এ দিন দুটিকে আনন্দ-উৎসবের সাথে সাথে এই আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদত-বন্দেগি করে সুসজ্জিত করতে পারলেই ঈদের তাৎপর্য আরো বেশি উদ্ভাসিত হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত