ঢাকা, রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

উত্তরবাংলাকে সবুজে পরিণত করেছে বিএমডিএ

  আকবর হোসেন, রাজশাহী প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:৪২  
আপডেট :
 ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:৪৮

উত্তরবাংলাকে সবুজে পরিণত করেছে বিএমডিএ
ছবি: প্রতিনিধি
আকবর হোসেন, রাজশাহী প্রতিনিধি

১৯৮৫ সালের আগে আমাদের এলাকায় বছরে একটি ফসল হতো। সেটাও বৃষ্টির পানিতে। একরে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান হতো। তবে যেবার বৃষ্টি সময়মতো হতো না সেবার কোনো ফসলে ঘরে আসতো না। এখন একরে ৮০ থেকে ৯০ মণ পর্যস্ত ধান হচ্ছে। কিছু কিছু জমিতে তিনটির বেশি ফসল হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্থাপিত গভীর নলকূপের পানি গম, ধান, শাক-সবজি, আমের বাগানসহ সব ধরনের ফসল উৎপাদনের ব্যবহার হয়। সুপেয় পানিও সরবরাহ করছে এই বিএমডিএ। ১৯৯০ সালের আগেও মরুর মতো ছিল এলাকা। এখন সব পাল্টে সবুজে পরিণত হয়েছে।

কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার শিতল ডাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুল লতিফ (৭০)।

উপজেলার রামরামপুর (জঙ্গলি মাঠ) গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম (৫৫) বলেন, সাপাহারে শত শত হেক্টর এলাকাজুড়ে আমের চাষ হয়। এটাকে সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে রাখছে বিএমডিএ’র পানির মাধ্যমে। পানির সঠিক সেচব্যবস্থা থাকায় আম পুষ্ট এ সুমিষ্ট হয়। আম এই দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে সাপাহারের আম। এই সাফল্যের দাবিদার কৃষি সম্পাসারণ কার্যালয় ও বিএমডিএ।

বিএমডিএ’র সাপাহার কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, উপজেলায় ৩২৩টি নলকূপসহ এলএলপি, সৌর শক্তি চালিত এলএলপি, খাস মজা খাল পুনঃখনন, খাবার পানি সরবরাহের জন্য ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ, বনায়নসহ পানির সঠিক ব্যবহারে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

১৯৮৫ সালে পূর্বে লাল কংকরময় মাটির উঁচু-নিচু টিলা, ছায়াহীন এক রুক্ষ প্রান্তর বরেন্দ্র অঞ্চল। চোখের দৃষ্টিসীমায় রোদে পোড়া বিরান ফসলের মাঠ। কোথাও পানির ছিটেফোটাও নেই। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে প্রাণ ওষ্ঠাগত শীর্ণকায় কৃষক, তার চেয়ে অধিক শীর্ণকায় তার হালের বলদ। দূরে বহুদূরে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে বাবলা আর ক্যাকটাসের বেড়া। এই হলো বরেন্দ্র ভূমি।

তবে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় প্রাচীনকালে বরেন্দ্র ভূমির চিত্র ভিন্ন ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ধর্ম ও কৃষ্টির প্রসারকালে এ অঞ্চল কৃষি ও শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশও সেসময় বেশ চমৎকার ছিল।

ইতিহাসবিদ নেলসনের (১৯২৩) মতে বরেন্দ্র অঞ্চল জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। উইলিয়াম হান্টারের (১৮৭৬) বর্ণনামতে বাংলার প্রায় সব ধরনের গাছই এ অঞ্চলে পাওয়া যেত। আম, জাম, তেঁতুল, তাল, খেজুর, বট, পাইকড়, শিমুল, বাবলা, বরই, বাঁশ, বেতসহ অসংখ্য লতাগুল্মের প্রাচুর্য ছিল এ বরেন্দ্র ভূমিতে।

কিন্তু বৃটিশ শাসনামলের সময় লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি জমির সম্প্রসারণ, বসতবাড়ি স্থাপন, শিল্পে কাঁচামালের যোগান, আসবাবপত্র ও গৃহনির্মাণ সামগ্রী, জ্বালানী হিসেবে কাঠের ব্যাপক ব্যবহার, রাস্তা, বাঁধ ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণের কারণে তিলে তিলে ধ্বংস হয়েছে অত্র এলাকার বনভূমি। মূলত ওই সময় থেকেই এ অঞ্চল মরূকরণ প্রক্রিয়ার শুরু হয়।

পরিবেশের স্বাভাবিক নিয়মে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। দেশের বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত যেখানে ২৫০০ মি.মি. সেখানে এ অঞ্চলে তা ১৪০০ মি.মি. এর বেশি নয়। ভাটির দেশ হওয়ায় উজানের দেশ থেকে নেমে আসা প্রায় সকল নদীতে বাঁধ সৃষ্টি/স্থাপন করায় অধিকাংশ নদীই (মহানন্দা, আত্রাই, পূর্ণভবা, শিব, পাগলা, করোতোয়া, তিস্তা) শুকনো মৌসুমে প্রায়ই শুকিয়ে যায়। এছাড়াও নদী বা খালে পানির প্রবাহ না থাকায়/কমে যাওয়ায় পলি জমে অধিকাংশ নদ-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে পর্যাপ্ত পানি ধারণ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। ফলে এ অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসও খুবই অপ্রতুল হয়ে পড়ে।

এসব নানা কারণে এ অঞ্চলের জমিগুলো ছিল বৃষ্টিনির্ভর একফসলী। যথ সময়ে বৃষ্টিপাত না হলে একটি ফসল উৎপাদনও ব্যহত হতো। বৃষ্টিনির্ভর বোনা আমন ফসলের পর বছরের বাকি সময় জমিগুলো গোচারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দীর্ঘ কাদাস্তর ভেদ করে মাটির গভীর আধার থেকে ভূ-গর্ভস্থ পানির উত্তোলনও সহজ ছিল না। তাই সেচ কার্যক্রম তো দূরের কথা এলাকাবাসী খাবার পানিসহ গৃহস্থালীর নানা কাজে পুকুর, খাল বিলের পানি ব্যবহার করতো। ঠিকভাবে ফসল উৎপাদন না হওয়ায় এ এলাকার জনসাধারণ অত্যন্ত দরিদ্র ছিল। তারা তিন বেলা পেটপুরে খেতে পেত না। এমনকি অনেক জোতদারেরাও অভাবি ছিল। তাই কাজের সন্ধানে এখানকার জনসাধারণ নিয়মিত অন্যত্র গমন করতো।

মাটির গঠন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের স্বল্পতার কারণে এ অঞ্চলে প্রচলিত গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ কাজ সম্ভব ছিল না। সেই প্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালে এ অঞ্চলের তৎকালীন বিএডিসি’র প্রকৌশলীগণ এক বিশেষ ধরণের গভীর নলকূপ উদ্ভাবন করে ভূ-গর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচের সুযোগ সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) আওতায় বরেন্দ্র সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প (ইওঅউচ) এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়।

প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১৫টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুকুর-খাল খননের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সৃষ্টি করা, বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে মরু প্রক্রিয়া রোধ করা এবং উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করা ও যাতায়াতের জন্য ফিডার রোড নির্মাণ করা ছিল এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

সময়ের স্বল্পতা, অর্থায়নের প্রতিকুলতাসহ নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়, কিন্তু অল্প সংখ্যক হলেও উল্লেখিত কার্যক্রমসমূহ এ এলাকার মানুষের মনে বিরাট আশার আলো জাগায়। বরেন্দ্র এলাকার বিরানভূমিতে সোনালী ফসলের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে পরবর্তীতে সমগ্র বরেন্দ্র এলাকার উন্নয়নের জন্য ১৯৯২ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সকল (২৫টি) উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে বিএমডিএ নামে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়।

মনিটরিং বিভাগ থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ২০১৮ সালে জারি করা ‘বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৮’ এর মাধ্যমে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি (সকল) জেলাকেই বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধিক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ওই আইন অনুসারে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালককে সদস্য-সচিব করে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

এছাড়া আইন অনুযায়ী কৃষিমন্ত্রীকে সভাপতি করে প্রতিমন্ত্রী, বরেন্দ্র এলাকার সকল সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিএডিসি, বিএমডিএ ও বিএআরসি’র চেয়ারম্যান, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী প্রধানগণ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৮৯৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত। যাদের মধ্যে ১৯৪ জন সহকারী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী রয়েছে। এসব নিয়ে এগিয়ে চলেছে এক সময়ের বেসরকারিভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি।

বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুর রশিদ জানান, বরেন্দ্র এলাকার উন্নয়ন কৃষি ও কৃষি পরিবেশে এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নসহ সেচ এলাকা ও আবাদী জমি সম্প্রসারণ, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বিপণন এবং পরিবেশ উন্নয়নে ফলদসহ অন্যান্য বৃক্ষরোপণে কাজ শুরু করে কৃষি সেক্টরে সফলতার সাথে এগিয়ে চলেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। বরেন্দ্র এলাকাকে দেশের শস্যভাণ্ডারে রুপান্তর এবং মরুময়তা রোধকল্পে বনায়ন ও সম্পূরক সেচের জন্য খাল-দিঘী পুনঃখনন ছাড়াও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে পণ্য বাজারকরণ এবং জীবণযাত্রার মান উন্নয়ন করার কাজ শুরু করে বিএমডিএ।

তিনি বলেন, সেচে ভূ-উপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানি সম্পদের উন্নয়ন ও যথাযথ ব্যবহার, কৃষি যান্ত্রিকিকরণ, বীজ উৎপাদন, সরবরাহ শস্যের বহুমুখীকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ রোপন ও সংরক্ষণ, সীমিত আকারে সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও রক্ষাবেক্ষণ, সেচযন্ত্র স্থাপন এবং লোকালয়ে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে বিএমডিএ’র কার্যক্রম শুরু করা হয়।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৬ জেলায় ১৫৭৯৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। ১৩৫০১ কিলোমিটার এলাকায় সেচের পানি বিতরণ ব্যবস্থা নির্মাণ, ৫৩২টি এলএলপি স্থাপন, ১১৯টি সৌরশক্তি চালিত এলএলপি, ২০২৪ কি.মি. খাস/মজা খাল পুনঃখনন, ৭৪৯টি ক্রসড্যাম নির্মাণ, ১১টি নদীতে পল্টুন স্থাপন, ৩১৪০টি খাস/মজা পুকুর পুনঃখনন, ১০৮৫০ হেক্টর জলাবদ্ধতা নিরসন- নওগাঁ জেলার রক্তদহ বিল, টেপাবিল, মনছুর বিল এবং রাজশাহী জেলার ছত্রগাছা বিল, দেবর বিল ইত্যাদি বিলের ৫৭২টি সোলার ডাগওয়েল নির্মাণ এবং ১১৪৪ কি.মি. সংযোগ রাস্তা নির্মাণ করেছে।

১৫৭৯টি পরিবারের খাবারপানি সরবরাহের জন্য ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ, বনায়নের লক্ষ্যে ২ কোটি ৫৮ লাখ গাছ লাগানো, প্রতি বছর ৬০০ মে. টন বীজ উৎপাদন, ১ লাখ ৪৮ হাজার ২১৮ কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৫৫৪১টি গভীর নলকূপ ও এলএলপি ৫১৬টি সেচযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে আবাদযোগ্য জমি দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৪১ হাজার ১৬ হেক্টর এবং সেচকৃত জমি ২২ লাল ৭ হাজার ৪৯৯ হেক্টর (আবাদযোগ্য জমির ৮৩.৫১%)। প্রায় ৯ লাখ ৮৯ হাজার কৃষক পরিবার উপকৃত হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান থেকে। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহ রয়েছে আরও আটটি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত