ঢাকা, রোববার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ৯ মাঘ ১৪২৮ আপডেট : ৮ মিনিট আগে

কাল তৃতীয় ধাপের ভোট: উত্তেজনার শঙ্কা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৭:২০  
আপডেট :
 ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৮:১২

কাল তৃতীয় ধাপের ভোট: উত্তেজনার শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাত পোহালেই ইউনিয়ন পরিষদের তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্নের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে প্রথম দুই ধাপের নির্বাচনের আগে-পরে যে মাত্রায় সহিংসতা দেখা গেছে, তাতে এবারও অজানা শঙ্কা রয়েছে জনমনে।

রোববার তৃতীয় ধাপে হাজারো ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে এ পর্যন্ত ২১০টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছে দুই হাজার ৫৪৩ জন। আর প্রাণ হারিয়েছে ৪০ জন। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনেও উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে।

পরিস্থিতি সামলে রাখতে নির্বাচন কমিশন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। পাশাপাশি সব পক্ষের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে কঠোর অবস্থানে গেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। করণীয় নির্ধারণে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে এ পর্যন্ত ২১০টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছে দুই হাজার ৫৪৩ জন। আর প্রাণ হারিয়েছে ৪০ জন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে।

এরই মধ্যে ২৮ নভেম্বর ১ হাজার ৭টি ইউপির নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে। বিভিন্ন কারণে স্থগিত হয়েছে ৭টি ইউপির ভোট। রোববার ভোট হবে ১০০০ ইউনিয়ন পরিষদে। এর মধ্যে ভোটার ২ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার ২৭৮ জন। ভোটকেন্দ্র ১০ হাজার ১৫৯টি। ভোটকক্ষ থাকছে ৬১ হাজার ৮৩০টি।

এদিকে ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ৫৬৯ জন। এদের মধ্যে চেয়ারম্যান ১০০ জন, সংরক্ষিত সদস্য ১৩২ জন ও সাধারণ সদস্য ৩৩৭ জন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের বাদ দিলে ভোটের লড়াইয়ে আছেন ৫০ হাজার ১৪৬ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৪০৯ জন চেয়ারম্যান পদে, ১১ হাজার ১০৫ জন সংরক্ষিত সদস্য পদে ও ৩৪ হাজার ৬৩২ জন সাধারণ সদস্য পদে লড়বেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী অন্য দলগুলো ইউপি নির্বাচনে সরাসরি অংশ না নিলেও তাদের তৎপরতা থেমে নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছেন। আবার আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এ কারণে নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়ে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে কঠোর অবস্থানে থাকার কথা ভাবছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। এ জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন। আরও বৈঠক করছেন রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা। র‌্যাব কর্মকর্তারাও আলাদাভাবে বৈঠক করছেন। সামনের দিনগুলোয় যাতে আর প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কঠোর দৃষ্টি রাখছে পুলিশ ও র‌্যাব।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচন ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও সরবরাহ বেড়েছে; যা নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোটের বিরোধকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, তৃণমূলে যেভাবে সহিংসতা বাড়ছে, তাতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ও এর জের থেকে যাবে। এতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ উদ্বিগ্ন। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ঠেকাতে এরই মধ্যে জেলার পুলিশ সুপারদের আরও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংঘাত-সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি উপজেলায় অতিরিক্ত পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাতে। তারপরও খুনোখুনি ও সংঘর্ষের ঘটনা যেন না ঘটে, এ বিষয়ে এসপিদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। থানা ও জেলার সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের ডেকে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ রয়েছে। কোথাও সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলে দ্রুত তা থানা পুলিশ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক সংশিষ্টরা বলছেন, ইউপি নির্বাচনকেন্দ্রিক বেশিরভাগ সহিংসতা হচ্ছে আওয়ামী ঘরানার প্রার্থীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী নেতারা নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচনে জয়ী করতেই জন্ম দিচ্ছে সহিংসতার।

যদিও শনিবার এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক দাবি করেছেন, নির্বাচনে সহিংসতার বড় অংশ ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের কারণে হয়েছে।

তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে সহিংসতারোধে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তারা জানান, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে বেশ কিছু জেলায় রক্তপাতের আশঙ্কা করছেন গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে সহিংসতা। এতে হতাহত হচ্ছেন অনেকে। সহিংসতা মোকাবিলায় আগাম গোয়েন্দা তথ্য রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন পুলিশের নীতিনির্ধারকরা। এ ছাড়া পুলিশের বিট অফিসারদের আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিটে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারা উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে আগাম সেই তথ্য নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

এবিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, আগামী নির্বাচনে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব নির্বাচনী সহিংসতা রোধ করার জন্য। সহিংসতা ঘটতে পারে এমন ‘পকেটগুলো’ চিহ্নিত করে আগাম গোয়েন্দা তথ্য নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে নজরদারি বাড়ানো ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূক ব্যবস্থা নিতে বলেছে ইসি।

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, যেসব সহিংসতা হচ্ছে তা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা করেও অনেক সময় তা ঠেকাতে পারছেনা। এখানে কে দায়ী বা কার দায়দায়িত্ব সেটা বিষয় নয়। আমরা সহিংসতা ঠেকাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে বৈঠক করেছি। ডিআইজি এবং এসপিরা ছিলেন। সহিংসতা ঠেকাতে আমাদের কড়া নির্দেশনা আছে।

ইউপি নির্বাচনে প্রথম ধাপে তফশিল ঘোষণা করা হয় গত মার্চে। দ্বিতীয় ধাপে গত সেপ্টেম্বরে এবং তৃতীয় ধাপে তফসিল ঘোষণা করা হয় গত অক্টোবরে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন শেষে তৃতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে রোববার ২৮ নভেম্বর। তবে এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সহিংসতা ঘটছে। আর গত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৮ মাসে সারাদেশে ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২১০টি। এতে আহত হয়েছেন দুই হাজার ৫৪৩ জন। প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ জন। এর মধ্যে গত অক্টোবরে এক মাসেই নিহতের সংখ্যা ১০।

বাংলাদেশ জার্নাল/এফজেড/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত