ঢাকা, বুধবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২ মাঘ ১৪২৮ আপডেট : ১০ মিনিট আগে

আজ মাস্টার দা সূর্য সেনের ফাঁসি দিবস

  চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০২

আজ মাস্টার দা সূর্য সেনের ফাঁসি দিবস
মাস্টার দা সূর্যসেন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি

ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী মহানায়ক মাস্টার দা সূর্যসেন ও তাঁর অন্যতম সহযোগী তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি দিবস আজ। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এই দুই জনের এই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল।

চট্টগ্রামের অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মৃতিবিজড়িত এই ফাঁসির মঞ্চ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। ফাঁসি কার্যকরের পর ব্রিটিশ শাসকেরা মাস্টার দা সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের মৃতদেহের সঙ্গে লোহার টুকরো বেঁধে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেয়। বিপ্লবী সূর্য সেন ‘যুগান্তর’ দলের চট্টগ্রাম শাখার প্রধান এবং ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের প্রধান সংগঠক।

মাস্টারদার পুরো নাম সূর্য কুমার সেন। সংক্ষেপে সূর্যসেন নামে অধিক পরিচিত। তবে মাস্টার দা নামে সহযোদ্ধাদের কাছে পরিচিত ছিলেন। ফাঁসির পর ব্রিটিশ সরকার তার লাশ গুম করে ফেলে।

সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রাজমনি সেন এবং মাতার নাম শশী বালা সেন। শৈশবে পিতা মাতাকে হারানো সূর্য সেন কাকা গৌরমনি সেনের কাছে মানুষ হয়েছেন। দয়াময়ী উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রথম পাঠ শুরু। তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন এবং চট্টগ্রামে ফিরে এসে আচার্য্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯১৯ সালে তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা পুষ্পকুন্তলা দত্তকে বিয়ে করেন।

১৯১৬ সালে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সূর্য সেন সরাসরি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হন। বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটি এই কলেজে তিনি অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে আসেন। তিনি যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। সূর্য সেনকে তিনি বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দেন। সূর্য সেন ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। ৪৯নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের নগেন্দ্রনাথ সেন ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে এসে সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী ও চারুবিকাশ দত্তের সাথে দেখা করেন।

১৯৩২ সালের জুন মাসে মাস্টারদা প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তকে বোমা সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম কারাগার ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেবার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনায় ১১ জন বিপ্লবী গ্রেপ্তার হন। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে সফল আক্রমণ চালান, তবে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং সায়নাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা বিশেষ ট্রাইবুনালে শুরু করে। এ ঘটনার পরে মাস্টারদা পটিয়ার কাছে গৈরালা গ্রামে আত্মগোপন করেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে সেখানে এক বৈঠকে ছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত।

ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর পুলিশকে জানিয়ে দেয়। রাত প্রায় ১০টার দিকে পুলিশ আর সেনাবাহিনী ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। রাতের অন্ধকারে গুলি বিনিময় করে কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত আর সুশীল দাসগুপ্ত পালিয়ে গেলেও রাত ২টার দিকে অস্ত্রসহ সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন ধরা পড়েন।

১৯৩৩ সালে সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তের বিশেষ আদালতে বিচার হয়। ১৪ আগস্ট সূর্যসেন ও তারেকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির রায় হয় এবং কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়।

১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কারাগারে সূর্যসেন ও তারেকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি কার্যকর হয়। তাদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসির পর লাশ দুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজারে তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।

মাস্টারদা অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। বর্তমানেও মাস্টারদা ভারত এবং বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এবং বিপ্লবী হিসেবে জনপ্রিয়। মাস্টারদার বীরত্বগাথা বর্তমান ভারত এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও পড়ানো হয়ে থাকে। মাস্টারদাকে সম্মান জানাতে ভারত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম, রাস্তার নাম, বিশ্ববিদ্যালয় হলের নাম আছে।

কলকাতা মেট্রো মাস্টারদা স্মরণে বাঁশদ্রোণী মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করেছে ‘মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশন।’ এছাড়াও, মাস্টারদার নামে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের নামকরণ করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি টলিউডে ১৯৮০ সালে মাস্টারদা ও তার সহযোদ্ধাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন শীর্ষক একটি চলচ্চিত্র মুক্তিলাভ করে। চলচ্চিত্রটির পরিচালক নির্মল চৌধুরী। বলিউডে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নিয়ে ‘খেলে হাম জি জান সে’ শীর্ষক একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।

সূর্যসেনের ফাঁসি দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার সকালে তার নিজ জন্মস্থান রাউজানের নোয়াপাড়ার সূর্যসেন পল্লীতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন নোয়াপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগসহ স্থানীয় সামাজিক সংগঠন। এছাড়া রাউজান উপজেলা সদরস্থ সূর্যসেন চত্বরে উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত