ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ৯ মিনিট আগে

সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করিনি

  ফরহাদ উজজামান

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২২, ০৮:৪৫  
আপডেট :
 ১২ মার্চ ২০২২, ১৮:১৮

সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করিনি
প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক (পিপিএম) ব্যাজ পরিয়ে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
ফরহাদ উজজামান

প্রতিটি কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করেছি বলেই নারী পুলিশ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি আমার। কারণ সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে আমি কখনো আপস করিনি। প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে করায় আমার পেশাদারিত্ব নিয়ে কখনো কথা শুনতে হয়নি। যখন দায়িত্বে থাকি, নিজেকে নারী পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি না। দায়িত্ব পালনের সময় নিজেকে শুধুই পুলিশ সদস্য ভাবি।

আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হামিদা পারভীন। যৌথ পরিবার থেকে উঠে আসা হমিদা ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে ১১তম। তার প্রত্যেক ভাইবোনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

১৯৯৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় মাস্টার্স করেন হামিদা পারভীন। এরপর ১৯৯৭ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এই অগ্রপথিক। সমাজে প্রচলিত বিবাহ পরবর্তী বাধ্যবাধকতা দমাতে পারেনি তাকে। নিজ ইচ্ছের গুরুত্বে এমফিল থাকলেও বাবার স্বপ্নপূরণে হয়ে যান বিসিএস ক্যাডার। ২০০৩ সালে যোগ দেন পুলিশে। প্রথম পোস্টিং ছিলো চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে। এরপর স্পেশাল ব্রাঞ্চে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে ডিএমপির রমনা ক্রাইম বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে আইভরিকোস্টে গিয়ে পেশাদারিত্বের জন্য প্রশংসিত হন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে র‌্যাবে প্রায় সাড়ে তিন বছর, আর্মড পুলিশের সহ-অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৬ সালে পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতির পরই প্রটেকশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান। সেখানে প্রথম নারী কর্মকর্তা হিসেবে তিন বছরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় সব ভিআইপির নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেন। দুইবার আইজিপি গুড সার্ভিস ব্যাজ ও ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদকে (পিপিএম) ভূষিত হন তিনি। ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট থেকে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হামিদা পারভীন।

নারী দিবস উপলক্ষে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হামিদা পারভীন কথা বলেছেন বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলাদেশ জার্নালের প্রতিবেদক ফরহাদ উজজামান।

বাংলাদেশ জার্নাল: কেমন আছেন?

হামিদা পারভীন : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: ১৪ ভাই-বোনের বড় পরিবার থেকে আজকের হামিদা হবার পেছনের গল্প জানতে চাই।

হামিদা পারভীন: ১৪ ভাই বোনের মধ্যে আমি ছিলাম ১১তম। বাবা এবং মা দুজনই আমাদের প্রতিষ্ঠিত হবার প্রেরণা। আমাদের গ্রামের বাড়ি ছিলো রাজবাড়ী জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। আমার বাবা সবসময় চাইতেন আমরা যেন শিক্ষিত হই। এর জন্য আমাদের সব কিছু বিক্রি করে রাজবাড়ী শহরে চলে আসেন তিনি। ওই সময়ে মেয়েদের অনেকেই পড়াশোনা করাতে চাইতেন না। এক্ষেত্রে আমার মায়ের অবদান অনেক বেশি। জীবনে যতটুকু অর্জন তা বাবার ইচ্ছে আর মায়ের অদম্য অনুপ্রেরণায়। মা আমাদের লেখাপড়ার জন্য সবসময় সুযোগ করে দিতেন। শুধু যে লেখাপড়া শিখিয়েছেন তাই নয়, গল্পের বই পড়া, হাতের কাজ শেখানো, কোরআন শরীফ পড়া এসব আমার মায়ের থেকেই শিখেছি। এতোগুলো ভাইবোন হয়েও সবার মধ্যে ত্যাগের প্রবণতা ছিলো। বাবা সবসময় বলতেন, কম্প্রোমাইজ অ্যান্ড সেক্রিফাইস। এ কথাই আমাদের অনুপ্রেরণা। আমরা একজন আরেকজনকে অনেক বেশি সেক্রিফাইস করেছি।

বাবা খুব ভালো ইংরেজি জানতেন। তার কাছ থেকেই ইংরেজি শেখা, যা আমার জীবনে এখনো কাজে লাগে। আমার সব চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাইবোনেরাও আমাদের বাড়িতে এসে বাবার কাছে পড়তেন। এসএসসির আগে প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। ক্লাস ফাইভ থেকে স্কলারশিপ পেয়েছি। ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছি রাজবাড়ী জেলায়। বিশ্ববিদ্যালয়েও এর ব্যতিক্রম হয়নি, ফার্স্ট ক্লাসের কারণে বৃত্তি পেয়েছি। যে কারণে পরিবারের ওপর পড়াশোনার চাপ অতটা পড়েনি। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জীবনে পরিবারের শিক্ষাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেটা আমরা খুব ভালোভাবে পেয়েছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: পুলিশে ট্রেনিং শেষে প্রথম কোথায় কাজ করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?

হামিদা পারভীন: যশোরে প্রথম প্রভিশনাল সময়ে ৬ মাস থাকি। এরপর প্রথম পোস্টিংয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে যোগ দেই। পরে স্পেশাল ব্রাঞ্চে দায়িত্ব পালন করি। ২০০৬ সালে ডিএমপির রমনা ক্রাইম বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ডিএমপিতে আমি প্রথম নারী পুলিশ হিসেবে ক্রাইম বিভাগে কাজ করি। আমার আগে কেউ ক্রাইম বিভাগে কাজ করেনি।

বাংলাদেশ জার্নাল: এসবি, ক্রাইমসহ অনেক জায়গায় কাজ করেছেন, কোথায় কাজ করতে তুলনামূলক বেশি ভালো লেগেছে?

হামিদা পারভীন: বিভিন্ন ইউনিটে কাজ করে মনে হয়েছে প্রত্যেকটার কাজের ধরন আলাদা। একেক জায়গায় কাজের একেক রকম মুল্যায়ন হয়। তবে আমি সবখানেই আমার সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছি। যখন ওসি ইমিগ্রেশনে ছিলাম সেখানে বিশাল দায়িত্ব ছিলো, কারণ আমার উপরেই তখন ফ্লাইট নির্ভর করতো। এরপর যখন র‌্যাবে যাই সেখানেও সবগুলো ব্যাটালিয়নের মামলা আমিই দেখতাম। কারণ আমি তদন্ত করতে পছন্দ করি। প্রটেকশন বিভাগে কাজ করার সময় তৃপ্তি ছিলো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারা। তখন আমার মনে হতো আমার হয়তো যোগ্যতা আছে। আমি তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের কাজের ক্ষেত্র একেবারেই আলাদা। এখানে সেবা নিতে আসা ভিকটিমরা অধিকাংশই অসহায়, নির্যাতিত। তাদের সহায়তা করতে পারার অনুভূতি কেমন?

হামিদা পারভীন: উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ আগের কাজের ক্ষেত্রগুলোর চেয়ে অনেক আলাদা। এখানে অনেকগুলো সেবা একসাথে দিতে হয়। সমাজের একেবারেই তৃণমূলের মানুষকে সেবা দেয়ার সুযোগ হয় এখানে। যাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই, উইমেন সাপোর্ট সেন্টারই তাদের একমাত্র ভরসা। এটা আমার বড় তৃপ্তির জায়গা। এখানে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, অসহায়-নির্যাতিত মানুষের অন্তরের দোয়া পাওয়া যায়। চোখের পানির মূল্য দিতে পারাটা সত্যিই প্রাপ্তির, যা আমার চাকরি জীবনের কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা হয় না।

বাংলাদেশ জার্নাল: কোন ধরনের অভিযোগ এখানে বেশি আসে এবং এখন পযর্ন্ত কতোগুলো সমস্যার সমাধান হয়েছে?

হামিদা পারভীন: আমাদের কাছে বেশিরভাগ গৃহনির্যাতনের অভিযোগ আসে। সেটা স্বামীর বাড়িতেই হোক বা গৃহকর্তা দিয়ে হোক, এসব অভিযোগই বেশি আসে। উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশনে এখন পযর্ন্ত ১৮ হাজারের বেশি ভুক্তভোগীর সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। এর বাইরেও ৩ জায়গা থেকে আমাদের কাছে ভুক্তভোগীরা আসেন। প্রথমত বিভিন্ন মামলা থেকে, দ্বিতীয়ত কেউ হারিয়ে গেলে বা পাওয়া গেলে এবং হাইকোর্ট থেকে কোনো মামলার দায়িত্ব এলে।

এছাড়াও পারিবারিক অভিযোগ, মানসিক বিষয়গুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য আসে। নারীদের অসুবিধা শুনতে ও সামাজিক নির্যাতন প্রতিরোধ করতে ২০২০ সালে ২৭ অক্টোবর কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়। এই টিমের জন্য একটি হটলাইন ০১৩২০০৪২০৫৫ নম্বর চালু করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকে এখন পযর্ন্ত এক হাজারের বেশি ভুক্তভোগীর সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। তবে সব অভিযোগের কল লিপিবদ্ধ করা হয় না। বেশির ভাগ স্বামীর দ্বারা স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগ। অভিযোগের মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের কলই বেশি। যৌতুকের জন্য নির্যাতনসহ অনেক সমস্যা নিয়ে নারীরা কল করছেন। কখনো কখনো নির্যাতিতা নারীর পরিবারের কেউ ফোন দিয়ে জানান তার বোন বা আত্মীয় কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল: ভুক্তভোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনি সহায়তার চ্যালেঞ্জ কীভাবে সামলাচ্ছেন?

হামিদা পারভীন: আমাদের সঙ্গে ১০টা এনজিও কাজ করছে। আইনজীবী নিয়োগ দিয়েও সহায়তা করে তারা। এর বাইরেও ভিকটিমের জন্য অনেক ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হয়। অনেক ভিকটিম আসেন, যারা সুস্থ কোনো চিন্তা করতে পারেন না। অনেকে দরজা-জানালা ভাঙচুর করেন। পুলিশ সদস্যদের মারধর পর্যন্ত করেন। অনেক সময় অসুস্থ বৃদ্ধ ভিকটিম আসেন। আবার ছোট বাচ্চাকে উদ্ধার করে পরিবারের জিম্মায় ফিরিয়ে দিতে হয়। এসব খুবই চ্যালেঞ্জিং। ওই মাত্রার সক্ষমতা না থাকলেও সেবা দেয়ার মানসিকতা থেকে কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করতে হয়।

বাংলাদেশ জার্নাল: অনেক সময় আপনাদের পরামর্শে একটা পরিবার আলাদা হওয়া থেকে আবার সংসার করছে। এসব নির্যাতিত নারীর পাশে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

হামিদা পারভীন : কাজের অনুভতি আসলে বলে বোঝোনো যাবে না। এই ভালো লাগা অন্যরকম প্রশান্তির। এমন অনেক নারী আছে, যারা তাদের কথাগুলো নিজ মাকেও বলতে পারেন না। অথচ সেসব কথা আমাকে বলে। যেসব নির্যাতিত নারী ও শিশু ভিকটিম এখানে আসেন, তাদের প্রথমেই বোঝানোর চেষ্টা করি এবং মানসিক স্বস্তি, সাহস দেই। প্রায় ভেঙে যাওয়া একটা ফ্যামিলিকে যখন এক করে দিতে পারি, সেসব নারীরা যখন আমাকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয় এর চেয়ে ভালোলাগার অনুভুতি আর কী আছে? তাদের চোখের পানির মুল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার নেই। সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা হচ্ছে- একটা মানুষকে সেবা দিয়ে হোক কথা দিয়ে হোক বা আমার সার্ভিস দিয়ে হোক, তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

বাংলাদেশ জার্নাল: করোনার সময়ে অনেকেই ঘরে থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো, পারিবারিক নির্যাতনও বেড়েছিলো। সেক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা কেমন ছিলো?

হামিদা পারভীন: ঢাকা মেট্রোপলিটনে ৫০টি থানা। এসব থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলাগুলো আমরা তদন্ত করি। এছাড়া করোনাকালে নারী ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে বেশি আসতো। কারণ, ওই সময় অনেকেই থানায় যেতে চাননি। তারা সবাই এখানে সহায়তা পেয়েছেন। আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি, আশ্বস্ত করেছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: অনেক সাফল্যের মাঝেও আপনাদের ব্যর্থতা কী?

হামিদা পারভীন: কিছু বিষয়ে আমাদের সংকট আছে, যার জন্য অনেক সময় কাজ করতে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। এর মধ্যে আমাদের লোকবলের অভাব। কারণ সারাদিনে আমাদের অসংখ্য ফোন রিসিভ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণের অভাব। বিশেষায়িত এই বিভাগের জন্য যে ধরনের প্রশিক্ষিত জনবল দরকার তা না থাকায় আলাদা প্রশিক্ষণ সেন্টারের প্রয়োজন। তৃতীয়ত, টেকনিক্যাল সাপোর্টের অভাব, স্পেশাল চাইল্ড ম্যানেজ করার মতো স্পেশালাইজড জনবল নেই। ডিজেবল ভিকটিমকে ম্যানেজ করার মতো জনবল দরকার। পাশাপাশি দরকার মেডিকেল সাপোর্ট, যেটা আমাদের নেই। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমাদের এটি করতে হয়। এসব ঘাটতি পূরণ হলে আমাদের এই বিভাগ নির্যাতিত নারী ও শিশুদের ভরসাস্থলে পরিণত করা সম্ভব। এরপরও আমরা সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করি।

বাংলাদেশ জার্নাল: প্রতিনিয়ত নারীরাই কেন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে? এর কারণ হিসেবে আপনার মতামত কী?

হামিদা পারভীন: এসব অপরাধ রোধে পারিবারিক সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এর সাথে ধর্মীয় মূল্যবোধ অবশ্যই আমাদের জাগ্রত করতে হবে। আরেকটা কারণ আমরা একা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি পরিবার থেকে। আমাদের দাদি নানি পরিবারের কেউ থাকে না। যাদের থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন প্রয়োজন। দৃষ্টিভঙ্গি শুধু পুরুষদের নয়, সবাইকেই পরিবর্তন হতে হবে। অনেক নারীর জন্য অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদেরও পরিবর্তন হতে হতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: ঢাকাসহ সারাদেশে ধর্ষণ বেড়েছে। অনেকেই অনেকভাবে বলে তবে এর কারণ কী এবং কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে?

হামিদা পারভীন: কোনো পরিবার থেকে একটা ছেলে যদি ধর্ষক হয়ে ওঠে, সেটি ঠেকানোর দায় কিন্তু পুলিশের নয়। এটা পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব। আমরা যেটা করি, তা হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গার্মেন্টসগুলোতে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি। ইভটিজিং, শ্লীলতাহানি, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার, সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করছি। কীভাবে চললে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদের জানাচ্ছি। কিন্তু পুরো বিষয়টা একা পুলিশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ ওই পরিমাণ সময় ও জনবল, কোনোটাই পুলিশের নেই। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে আগে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে হবে। কারণ সমাজে যারা দুর্বল তারা সবসময় বেশি নির্যাতিত হয়। এর জন্য নারীদের সাবলম্বী হওয়া অনেক বেশি দরকার।

বাংলাদেশ জার্নাল: একজন নারী পুলিশ হওয়ার জন্য আলাদাভাবে কোনো সমস্যায় পড়েছেন কিনা? সহকর্মীদের থেকে কটূক্তির শিকার হয়েছেন?

হামিদা পারভীন: আমি ব্যক্তিগতভাবে এখন পযর্ন্ত নারী হবার জন্য কোনো সমস্যায় পড়িনি। কারণ আমার প্রতিটি কাজ অতন্ত্য গুরুত্বের সাথে করি। পেশাদারিত্বের সাথে আমি কখনো কম্প্রোমাইজ করিনি। প্রতিটি কাজ আমি সঠিকভাবে করি, এর জন্য আমার পেশাদারিত্ব নিয়ে কখনো কতা শুনতে হয়নি। আমার সিনিয়র বা সহকর্মী যারা আছে তারা সবসময় আমাকে ভালো চোখে দেখেছেন। এর জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ আমাকে দেয়া হয়েছে। আমি নিজেকে একজন মানুষ ভাবি, যখন আমি দায়িত্বে থাকি নিজেকে নারী পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি না। আমি শুধুই একজন পুলিশ। নিজেকে নারী ভেবে আমি কখনোই আলাদা সুযোগ নেইনি।

বাংলাদেশ জার্নাল: যেসব নারীর পুলিশে আসার ব্যাপারে আগ্রহ আছে, তাদের বিষয়ে কোনো পরামর্শ আছে কিনা?

হামিদা পারভীন: পুলিশ একটা চ্যালেঞ্জিং পেশা। এর জন্য আগে নিজেকে যোগ্য করতে হবে। নারী পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হিসেবেও। অলংকৃত করেছেন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের পদও। নারীর এই অগ্রযাত্রার পথ সহজ ছিলো না কখনোই। তাই এখানে মেধা, যোগ্যতা, সততা এবং পেশাদারিত্ব সবকিছু নিয়েই পুলিশে আসতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: নারীদের পিরিয়ড নিয়ে এখনো অনেক অজ্ঞতা আছে। অনেক সময় এটাকে পুরুষরা মজা হিসেবেও নেয়। এখনো মেয়েরা তাদের এই সমস্যার কথা বলতে লজ্জা পায়। এটার কারণ কী এবং এর থেকে বের হয়ে আসার উপায় কী?

হামিদা পারভীন: অনেকেই এটার জন্য পুরুষের মানসিকতাকে দায়ী করে। এখানে পুরুষের কোনো ভূমিকাই নেই। একজন মা তার সন্তানকে শেখাবেন। এটা নারীদের খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। এটাকে রাখ-ঢাক করে দেখার কিছু নেই। বরং এটাকে ভালোভাবে জানলে পরবর্তীতে আরও অনেক সহজ হয়। যেমন একটা পরিবারে ভাইয়ের কথা বলা যায়। সে যদি জানে তার বোনের প্রতিমাসে একটা চেঞ্জের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে পিরিয়ড হয়, তাহলে তার মধ্যে নেগিটিভ চিন্তা আসবে না। পরবর্তীতে সে তার কোনো বন্ধু বা যখন অফিসের কর্মকর্তা হবে সে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টা নেবে। কোনো নারী সহকর্মী তার এই সমস্যার কথা বললে তাকে কনসিডার করবে। কারণ সে পরিবার থেকেই তার, মা, বোন, ফুফুদের দেখেছেন সবাই একই প্রসেসে যাচ্ছে। তাহলে এই সময়ে আমার একজন সহকর্মীকে কনসিডার করা উচিত। কারণ শরীরে যেমন, জ্বর, কাশি, ঠান্ডা হয় পিরিয়ডও তেমনই স্বাভাবিক। এটা তো গোপন করার মতো কিছু না। পরিবার থেকে সঠিক শিক্ষা পেলে এগুলো নিয়ে মজা করবে না।

বাংলাদেশ জার্নাল: পুলিশে কি নারীরা সমানভাবে অবদান রাখতে পারছেন বলে আপনি মনে করেন?

হামিদা পারভীন: নারী পুলিশ সদস্যরা মেধা, যোগ্যতা, সাহসিকতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন। জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ, জলদস্যুদের দমন ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ভূমিকায় থেকে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি অগ্রিম গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র মোকাবিলায়ও অবদান রাখছেন নারী সদস্যরা। কাজ করছেন নারী নির্যাতন, পাচার ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, একতরফা তালাকের ক্ষেত্রে দেনমোহর ও খোরপোষ আদায় এবং যৌতুকসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও।

বাংলাদেশ জার্নালকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন ডিসি হামিদা পারভীন

বাংলাদেশ জার্নাল: বিয়ের পর আপনি চাকরিতে যোগদান করেছেন, সেক্ষেত্রে আপনার স্বামীর পক্ষ থেকে বা বা সহোযোগিতা পেয়েছেন কিনা?

হামিদা পারভীন: ১৯৯৭ সালে আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি এমফিলেও ভর্তি হয়েছিলাম। এরপর বিসিএস সার্ভিসের জন্য স্টাডি শুরু করি। একজন হামিদা পারভীন থেকে আজকে পুলিশ সুপার হবার পেছনে আমার স্বামীর অবদান অনুপ্রেরণা অনেক বেশি। তিনি কখনোই আমার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। সমসময় আমাকে সাহস যুগিয়েছেন। যার জন্য আমি আমার কাজগুলো ঠিক মতো করতে পেরেছি। এরপর যখন আমার মেয়ে হয় তাকে অনেক ছোট রেখে আমি শারদায় ট্রেনিংয়ে চলে গেছি। মেয়ে যখন একটু বড় হলো সেও তার মায়ের কাজ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। আমার মায়ের কাছে আমি আমার মেয়েকে রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করেছি। আমার মা আমার জন্য নিজের সবটুকু করেছেন।

বাংলাদেশ জার্নালকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

হামিদা পারভীন: অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ জার্নাল। আশা রাখি দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে বাংলাদেশ জার্নাল। আমি বাংলাদেশ জার্নালের সাফল্য কামনা করছি। ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে/ওএফ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত