ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

তপ্ত দুপুরেও সড়ক সামলান সাবিনা

  ফরহাদ উজজামান

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২২, ০৯:২৭  
আপডেট :
 ০৮ মার্চ ২০২২, ১০:২৯

তপ্ত দুপুরেও সড়ক সামলান সাবিনা
নারী ট্রাফিক সার্জেন্ট সাবিনা ইয়াসমিন
ফরহাদ উজজামান

বেলা তখন সাড়ে ১২টা। ফাল্গুন শেষ না হলেও দিনের বেলা তেঁতে উঠছে প্রকৃতি। কাঠ-ফাটা রোদ্দুর তীব্র উত্তাপ ছড়াচ্ছিল নারী সার্জেন্টের মাথার ওপর। ঘেমে একাকার নারী সার্জেন্টের অবশ্য সেদিকে খুব একটা খেয়াল নেই। তিনি ব্যস্ত সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায়। গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা আর সড়কে গাড়ির জট ছাড়াচ্ছিলেন।

রাজধানীর ব্যস্ততম রামপুরা আবুল হোটেল মোড় এলাকায় ডিউটিরত নারী ট্রাফিক সার্জেন্ট কাজের ফাঁকে ফাঁকেই কথা বলছিলেন বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে। মাঝে মধ্যে ছুটে যাচ্ছিলেন রাস্তায়। বেঁধে যাওয়া যানবাহনের জট ছাড়িয়ে আবার ফিরছিলেন কথায়।

সাবিনা ইয়াসমিনের বাড়ি শেরপুরে। ৮ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেছেন শেরপুর থেকেই। ২০১৪ শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স করেন। আইনজীবী হবার ইচ্ছা থাকলেও ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক মতিঝিল বিভাগের রামপুরা জোনের সার্জেন্ট হিসেবে।

নারী দিবস উপলক্ষে সাবিনা ইয়াসমিন কথা বলেছেন তার পেশা, পারিবারিক জীবন ও কর্মব্যস্ততা নিয়ে।

সোমবার দুপুরে ট্রাফিক মতিঝিল বিভাগের রামপুরা জোনের আবুল হোটেল পুলিশ বক্সের সামনে কথা হয় সার্জেন্ট সাবিনা ইয়াসমিন সঙ্গে।

বাংলাদেশ জার্নালকে তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই ইচ্ছা ছিলো দেশের জন্য কিছু করার। পুলিশের ইউনিফর্মের প্রতি ছিলো বিশেষ আকর্ষণ। যে ইউনিফর্ম পরে সব শ্রেণির মানুষকে সেবা দেয়া সম্ভব। রাষ্ট্রপতি থেকে সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়া যায়। তাই এই পেশায় এসেছি।

ট্রাফিকে দায়িত্ব পালন করতে কেমন লাগে- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবিনা বলেন, পেশাটাকে ভালোবেসেই বেছে নিয়েছি। তাই প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করি। সড়কে নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভালোই লাগে। সব নারী সার্জেন্টই দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। ডিএমপির ট্রাফিকের সিনিয়র কর্মকর্তারা আমাদের নারী সার্জেন্টদের প্রশংসা করছেন। এতে আমাদের খুব ভালো লাগে।

ল’তে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও বা এতো চাকরি থাকতে ট্রাফিক সার্জেন্টের চাকরি কেন? সাবিনা বলেন, বিষয়টি তখন চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিল আমার কাছে। আর ছোটবেলা থেকেই জীবনে চ্যালেঞ্জিং কিছু একটা করার টার্গেট ছিল। সেই চ্যালেঞ্জটা জয় করার জন্যই আসলে পুলিশে আসা।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে সার্জেন্ট সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, গণপরিবহনের চালকরা বিভিন্নভাবে কটু কথা বলে থাকেন। এছাড়া, নারী সার্জেন্ট দেখে সবাই একটু তাকান। আর নারী হয়ে বাইরে যেভাবেই বের হই না কেন যারা কটু কথা বলার তারা বলবেই।

এই বিষয়গুলো কিভাবে নেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব বিষয় হ্যান্ডেলিং করার প্রশিক্ষণ আমাদের দেয়া হয়েছে। আর সবার এসব কথা আমি আমলেও নেই না। এসব ছোটছোট কিছু বিষয় ছাড়া আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এসবও আস্তে-আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।

পুরুষ সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থেকে সহযোগিতা ও অসহযোগিতার বিষয়ে এই নারী সার্জেন্ট বলেন, পুরুষ সার্জেন্টরা আমাদের সবকিছু শিখিয়ে দিচ্ছেন। কিভাবে মামলা করতে হবে? কেমন করে চালকদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে? তাদের সহযোগিতায় কাজ আরও সহজ হয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা নারী সার্জেন্ট হিসেবে কাজ করি তাদের ব্যাপারে সবসময়ই সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখান আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় বেয়াড়া চরিত্রের লোকজনকে হ্যান্ডেল করতে হয়। কোনো কোনো যানবাহন চালকের ভূমিকা হয়ে ওঠে মারমুখী। বিশেষ করে সমাজের একটু প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাবানরা চেষ্টা করেন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সবকিছু নিজেদের মতো করে চালাতে। এ রকম ক্ষেত্রে একদিকে যেমন আমরা শক্ত ভূমিকা নেই, তেমনি শক্ত অবস্থান নিতে গিয়ে কোনো জটিলতা দেখা দিলে আমাদের সিনিয়ররাও পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করেন। সাহস জোগান।

নারী সার্জেন্ট হিসেবে কখনো আলাদা সমস্যায় পড়তে হয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে সাবিনা বলেন, নারী সার্জেন্ট দেখে অনেকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু এসব আমরা পাত্তা দেই না। আমরা আমাদের কাজ করি। এসব এখন আর মাথায় আসে না। অনেকে ভাবেন, নারীরা তেলাপোকা দেখে ভয় পায়, গাড়ি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে? তবে আমরা আমাদের যোগ্যতা দিয়ে নিজেরে প্রমাণ করেছি।

নারী বলে প্রথম প্রথম চালকরা পাত্তা দিত না। তবে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। আমি পুরোপুরি নতুন। আমার সঙ্গে যারা কাজ করছেন, তারা অনেক সহযোগিতা করছেন।

চ্যালেঞ্জ কোনটি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি থামানোর কাজটি একটু বেশি চ্যালেঞ্জের মনে হয়।

ট্রাফিকে কাজের সমস্যাগুলো কোথায়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ডিএমপিতে নারী ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। পাশাপাশি নারীদের জন্য ওয়াশরুম ব্যবহার করা একটা বড় সমস্যা। তবুও সব কিছু মেনে নিয়েই এসেছি। কাজ করে যাচ্ছি। ট্রাফিক বিভাগে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল খুব কম। এরকম একটি অবস্থায় দেশে যদি আরও নারী সার্জেন্ট নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে কাজের ক্ষেত্রে আরও সহজ একটা পরিবেশ হতো আমাদের। শেয়ারনেসের বিষয়টিও থাকত। নারী হিসেবে আমি তো সবকিছু সবার সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না।

নারী সার্জেন্ট হবার পেছনে পরিবার থেকে বাঁধা এসেছে কিনা জানতে চাইলে সাবিনা বলেন, ৮ ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। আমার পরিবারের সবাই চাইতেন আমি যেন শিক্ষিত হই। এক্ষেত্রে আমার মায়ের অবদান অনেক বেশি। জীবনে যতটুকু অর্জন তা বাবার ইচ্ছে আর মায়ের অদম্য অনুপ্রেরণায়। এতোগুলো ভাইবোন হয়েও সবার মধ্যে সবার আন্তরিকতা ছিলো। মেয়ে হিসেবে কখোনই অবহেলা করেনি।

পুলিশ বাহিনীতে নারী সার্জেন্ট নিয়োগ-প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৪ সালে। এর মধ্যে ডিএমপিতে ট্রাফিকের নারী পুলিশ হিসেবে কর্মরত আছেন ৫২ জন। এর মধ্যে সার্জেন্ট ৩২ জন। এএসআই (নিরস্ত্র) ৪ জন ও কনেস্টবল ১৬ জন।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে/ওএফ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত