‘আমাদের দুঃখ কেউ বোঝে না’

মজুরি ৩০০ টাকা না হওয়া পর্যন্ত চলবে চা শ্রমিকদের ধর্মঘট

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২২, ১৭:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

  এম. এ. কাইয়ুম, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকে শনিবার থেকে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারা দেশের ১৬৬ চা-বাগানে ধর্মঘট পালন করছে তারা। বর্তমানে দিনে ১২০ টাকা মজুরি পান চা শ্রমিকরা। তারা এই মজুরি ‘অন্যায্য’ ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন। তাই মজুরি ৩০০ টাকায় উন্নীত করার দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন তারা।

গত মঙ্গলবার থেকে মজুরি ৩০০ টাকা করার দাবিতে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে আসছিলেন শ্রমিকেরা। তবে দাবি মেনে না নেয়ায় গতকাল শুক্রবার অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দেয় চা-শ্রমিক ইউনিয়ন।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, চা-শ্রমিকরা মৌলভীবাজার-বড়লেখা আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন এলাকার সড়ক অবরোধ করে রাখে।

স্থানীয় বাসিন্দা কুলাউড়া সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুল হাসান সিপন বলেন, মৌলভীবাজার-বড়লেখা আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন জায়গায় চা-শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেছেন। ফলে লুহাউনি ও ব্রাক্ষণবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সালেক বলেন, কিছু স্থানে সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে চা-শ্রমিকদের বুঝিয়েছি। সেখানে তারা সড়ক অবরোধ না করেই তাদের কর্মসূচি পালন করছেন।

সকাল থেকেই মৌলভীবাজার লোয়াইউনি চা-বাগানে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি আদায়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে। কর্মসূচিতে আসা নারী চা শ্রমিক সবিতা গড়াইত বলেন, আমাদের দুঃখ কেউ বোঝে না। আমরা ৪ দিন কর্মবিরতি করেছি। কিন্তু কেউ আমাদের এসে আশ্বাস দিলো না। আমরা এত কষ্ট করে কাজ করি, কিন্তু আমাদের ন্যায্য মজুরি দেয়া হয় না।

তিনি বলেন, চাল, ডাল, তেল— সবকিছুর দাম বেড়েছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ আছে। অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে হয়। এর মধ্যে প্রতিদিনই জিনিসের দাম বাড়ছে। কিন্তু আমাদের মজুরি বাড়ছে না।

একাধিক চা শ্রমিক জানান, চা শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। শ্রম আইন অনুসারে চা শ্রমিকদের পক্ষে দরকষাকষি করে এই সংগঠন। সম্প্রতি চা-বাগান মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনয়ায় শ্রমিক ইউনিয়ন চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, বোনাস প্রদান, ছুটিসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করে। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। পরবর্তীতে মালিকপক্ষ মজুরি ১৪ টাকা বাড়নোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু চা শ্রমিকরা এই মজুরি বৃদ্ধিকে ‘পরিহাস’ বলে মনে করছেন।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট চলছে। দেশের ১৬৬ চা বাগানে এ ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। ৩০০ টাকা মজুরি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আন্দোলন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে। দেশের বিভিন্ন বাগানের চা-শ্রমিকেরা একত্রিত হয়েছেন। বাগানে বাগানে সমাবেশ হবে।

সিলেট বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম বলেন, চা-শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর বিষয়টি মূলত মালিক পক্ষ ও চা-শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে হয়ে থাকে। সেখানে আমরা প্রভাব খাটাতে পারি না। তারা যদি আমাদের কাছে বিচারপ্রার্থী হয় সেক্ষেত্রে আমরা ২ পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে মীমাংসা করতে পারি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা সংসদের সিলেট বিভাগের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের আলোচনা চলাকালে এভাবে কাজ বন্ধ করে আন্দোলন করা বেআইনি। এখন চা-বাগানে ভরা মৌসুম। কাজ বন্ধ রাখলে সবার ক্ষতি। তারাও এই মৌসুমে কাজ করে বাড়তি টাকা পায়।

মালিকপক্ষের সঙ্গে চা-শ্রমিকদের আলোচনা প্রায় ১৯ মাস ধরে চলছে। কিন্তু শ্রমিকদের নতুন কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না, জানতে চাইলে গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, আমরা সরকারকে অনুরোধ করেছি যাতে তাদের কাজে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১৬৬টি চা বাগান রয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে