গার্ডার চাপায় ৫ জনের মৃত্যু: ক্রেনচালকসহ ১০ আসামি রিমান্ডে

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২২, ১৮:১৩ | অনলাইন সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ছবি- সংগৃহীত

রাজধানীর উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে একই পরিবারের পাঁচজন সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার ১০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। 

শুক্রবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আহমেদ শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিন মামলার সুষ্ঠু-তদন্তের জন্য ক্রেনচালক আল-আমিন হোসেন ওরফে হৃদয় (২৫), রাকিব হোসেন (২৩) ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সেফটি ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলফিকার আলী শাহকে (৩৯) ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইয়াসীন গাজী। শুনানি শেষে বিচারক তাদের চারদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এ ছাড়া রুবেল (২৮), আফরোজ মিয়া (৫০), ইফতেখার হোসেন (৩৯), আজহারুল ইসলাম মিঠু (৪৫), তোফাজ্জল হোসেন ওরফে তুষার (৪২), রুহুল আমিন মৃধা (৩৩) ও মঞ্জুরুল ইসলামকে (২৯) দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে বুধবার রাতে ঢাকা, গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাট থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গত ১৫ আগস্ট বিকেল সোয়া ৪টার দিকে উত্তরায় প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন কাত হয়ে গার্ডার চাপায় প্রাইভেটকারের পাঁচ আরোহী মারা যান। ওই গাড়িতে থাকা নবদম্পতি গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। হতাহতরা ঢাকায় একটি বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফিরছিলেন। নিহতরা হলেন- আইয়ুব আলী হোসেন রুবেল (৫৫), ফাহিমা আক্তার (৩৮), ঝরণা আক্তার (২৭), জান্নাতুল (৬) ও জাকারিয়া (৪)। এরই মধ্যে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আহত নবদম্পতি হৃদয় (২৬) ও রিয়ামনি (২১) উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন।

ঘটনার রাতেই নিহত ফাহিমা আক্তার ও ঝরণা আক্তারের ভাই মো. আফরান মণ্ডল বাবু বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় এ মামলা করেন। মামলা নম্বর-৪২। মামলায় অবহেলাজনিত ক্রেইন পরিচালনাকারী চালক, প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এরই মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২২ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত।

এদিকে বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার চাপায় মানুষের মৃত্যুকে সংশ্লিষ্ট  ঠিকাদার, পরামর্শক ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারি সংস্থাগুলোর অবহেলা, উদাসীনতা ও গাফিলতি জনিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সেইসঙ্গে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার রাতে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এমন দাবি জানিয়েছেন।  

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারাদেশেই অবকাঠামোগত বৃহৎ প্রকল্পসহ নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জননিরাপত্তা ও জনভোগান্তি নিয়ে ইতোপূর্বে বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছিল যাতে সাধারণ মানুষের জান-মালের বিবিধ রকমের ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছিলো। প্রকল্প দলিল ও সরকারের নির্মাণ সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইনে নির্মাণকালীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতে করণীয়সমূহ সুনির্ধারিত থাকা সত্যেও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারি সরকারি সংস্থাসমূহের প্রত্যেকেই এই ব্যাপারে দিনের পর দিন উদাসীনতা ও গাফিলতি দেখিয়ে যাচ্ছেন, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঠিকাদারসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও পেশাজীবীরা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা  নিশ্চিতে এবং আইনের বিধান ও প্রকল্পের কার্যাদেশের শর্তাবলী যথাযথভাবে প্রতিপালনে দিনের পর দিন বেপরোয়া মনোভাব দেখিয়েই চলেছেন। এই ধরনের ঘটনাকে কোনভাবেই দুর্ঘটনা বলবার সুযোগ নেই, বরং এই সব বেপরোয়া ঘটনাসমূহ সুস্পষ্টভাবেই গাফিলতি ও অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড।

তিনি আরও বলেন, ইতোপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে গার্ডার পড়ে মানুষের মৃত্যুসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ নিরাপত্তা জনিত অবহেলার কারণে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। বিআরটি প্রকল্পেই গত বছরের শুরুতে ঘটে যাওয়া গার্ডার দুর্ঘটনাসমূহের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবিধান করলে এই ধরনের বেপরোয়া ঘটনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু এড়ানো যেত বলে মনে করে আইপিডি। এক্ষেত্রে গার্ডার দুর্ঘটনার দায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসহ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কোনভাবেই এড়াতে পারে না। আইপিডি মনে করে, উক্ত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হলে বিআরটি প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতি জনিত হত্যাকাণ্ড এড়ানো যেত।

অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আইপিডি মনে করে, নির্মাণ সংশ্লিষ্ট কোন কাজে অবহেলাসৃষ্ট ঘটনাসমূহের সুস্পষ্ট তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবার গাফিলতি যথাযথভাবে চিহ্নিত করে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা হলে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ একেবারেই অসম্ভব। এটা না করা গেলে সাধারণ জনগণ ও নির্মাণ শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। গার্ডার ধ্বসে মৃত্যুর ঘটনায় যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ঠিকাদার কোম্পানি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা ও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ভবিষ্যৎ করণীয়সমূহ নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/সুজন/এমএস