ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

রহস্যে ঘেরা জঙ্গি ছিনতাই উদ্ধার নিয়েও রহস্য

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৫৩

রহস্যে ঘেরা জঙ্গি ছিনতাই উদ্ধার নিয়েও রহস্য
ফাইল ফটো
নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালত প্রাঙ্গণ থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনার পর ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও আদালত থেকে ছিনিয়ে নেয়া জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। অথচ ঘটনার পর পরই বলা হয়েছিল নজরদারিতে আছে তারা।

রাজধানীতে রেড অ্যালার্ট জারি, দেশের বিভিন্ন আদালতে নিরাপত্তা জোরদার ও সীমান্তে সতর্কতা জারির পরও তাদের খোঁজ না মেলায় ঘটনাটি রহস্যাবৃত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। এদিকে ছিনিয়ে নেয়া দুই জঙ্গির অবস্থান কোথায় এবং তারা অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনায় জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরেকজন আত্মসমর্পণ করেছে। সে সঙ্গে ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে দিনদুপুরে এভাবে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনার পর দায় খুঁজছেন সংশ্লিষ্টরা।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিতে মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে। এতে অর্থের জোগানদাতা হিসেবে কতিপয় ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতার নাম বলেছেন রিমান্ডে থাকা এক আসামি। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে ঘটনার ১০ দিন পর আরেকজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার নাম মাহমুদ আলম বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি জসিমউদ্দীন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৮ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হলো। সর্বশেষ গত ২৭ নভেম্বর দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার সময় বাধা দিতে গিয়ে আহত হওয়া পুলিশ কনস্টেবল নুরে আজাদকে বরখাস্তের কথা জানিয়েছিলেন ডিসি জসিমউদ্দীন। এছাড়া জয়নাল নামের এক কনস্টেবলকে বরখাস্তের কথাও জানান তিনি।

এর আগে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্তের কথা জানানো হয়েছিল। তারা হলেন- ঢাকার কোর্ট ইন্সপেক্টর মতিউর রহমান, হাজতখানার ইনচার্জ এসআই নাহিদুর রহমান, আসামিদের আদালতে নেয়ার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এটিএসআই মহিউদ্দিন, কনস্টেবল শরিফুল হাসান ও কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার।

গত ২০ নভেম্বর দুপুরে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশকে মারধর করে তাদের চোখে-মুখে পিপার স্প্রে করে প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি সুনামগঞ্জের ছাতকের মইনুল হাসান শামীম ও লালমনিরহাটের আদিতমারীর আবু ছিদ্দিক সোহেলকে ছিনতাই করে নিয়ে যায় তাদের সহযোগী জঙ্গিরা। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পলাতক দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিলে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ। সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়। দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করে পুলিশ।

এছাড়া জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রেক্ষাপটে কারাগারের পাঁচ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কর্মস্থল বদল করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ বদলির আদেশ জারি করে। আদেশে ঢাকা বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে রংপুরে। কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. আলতাব হোসেনকে রংপুর থেকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। আর চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক এ কে এম ফজলুল হককে ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

গাজীপুরে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার মো. আব্দুল আজিজকে বদলি করা হয়েছে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার সামলে আসা জ্যেষ্ঠ জেল সুপার সুব্রত কুমার বালাকে পাঠানো হয়েছে কাশিমপুরে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, আদালত থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা হয় বেশ কিছুদিন আগে। কাশিমপুর কারাগারে বসেই এই পরিকল্পনা চলে। প্রথমে প্রিজন ভ্যানে হামলা করে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। দীর্ঘদিন রেকি শেষে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহজ হওয়ায় আদালত থেকে জঙ্গি ছিনতাইয়ের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করা হয়।

সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে, আদালতে জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া একজনসহ ১২ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাদের প্রত্যেকেই এ ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। বিশেষ করে এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থের জোগানদাতা, কারাগার থেকে কিভাবে বাইরের জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতো, এবিটির সামরিক শাখার প্রধান মেজর (অব.) জিয়ার কর্মকাণ্ডসহ অন্য আর কোন কোন নেতার নেতৃত্বে তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন রিমান্ডে থাকা আসামিরা।

পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কে বা কারা রয়েছেন এমন প্রশ্নে মেহেদী সিটিটিসিকে জানিয়েছেন, ছয় মাসের দীর্ঘ পরিকল্পনার পর তারা আদালত থেকে সহযোগীদের (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি) ছিনিয়ে নিতে সফল হন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ধরা পড়ার আগে মেহেদী হিযবুত তাহরীরের সদস্য ছিলেন। পরে আনসার আল ইসলাম বা আনাসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)-এর প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

এদিকে পুলিশের কাছ থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার পর জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ৬ বছর আগে করা একটি মামলা সামনে এসেছে। ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থানায় মামলাটি করা হয়। মামলার তদন্তে গিয়ে আনসার আল ইসলামের কার্যক্রম, প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা।

২০২১ সালের ৮ জুলাই ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার চার্জশিট জমা দেয়া হয়। ২০ জনের বিরুদ্ধে এ চার্জশিট দেয়া হয়েছিল। চার্জশিটে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়, তারা সবাই বিভিন্ন অপারেশনে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল বলে তদন্তকালে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। মোহাম্মদপুরের একটি বাড়িতে স্থাপিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জঙ্গিদের ইমেপ্রাভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডিএস) তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। প্রতিটি দলকে ২ মাস করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চার্জশিটে বলা হয়, সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর (বরখাস্ত) জিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান ছিলেন। সংগঠনের অপর দুই নেতা শাহীন আলম ও শাহালাম ওরফে সালাউদ্দিনের সঙ্গে তিনি প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতেন। শাহীন ও শাহালাম বর্তমানে কারাগারে থাকলেও জিয়া পলাতক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, ব্লগার ও মুক্তমনাদের ৬টি হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী জিয়া। গত ২০ নভেম্বর আদালত থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনাও তার। পলাতক দুই জঙ্গির মধ্যে মইনুল হাসান শামীম জিয়ার মোহাম্মদপুর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দ্বিতীয় ব্যাচে এবং আবু সিদ্দিক সোহেল তৃতীয় ব্যাচে প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৬ সালের ওই সন্ত্রাসবাদী মামলায় চার্জশিটভুক্ত ২ আসামি ইদি আমিন এবং মেহেদী হাসান অমি জামিনে ছিলেন। জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলার পর ইদি আমিন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার পেছনে এ দুজন সমন্বয়কারী ও পরিকল্পনাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার আহমেদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা মামলার তদন্ত করে আনসার আল ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছি। সংগঠনের সদস্য ও নেতৃত্ব সম্পর্কে ভালো ধারণা পেয়েছি।

এদিকে পুলিশের হেফাজত থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ১০ দিনেও কেউ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।

বাংলাদেশ জার্নাল/জিকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত