ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

‘পরিশ্রমী বলেই আমরা শিল্পীরা মানসিক চাপ নিয়েও কাজটা শেষ করে দিই’

  ইমরুল নূর

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২২, ১৬:৫৯  
আপডেট :
 ২১ মার্চ ২০২২, ১৪:৫৯

‘পরিশ্রমী বলেই আমরা শিল্পীরা মানসিক চাপ নিয়েও কাজটা শেষ করে দিই’
ইমরুল নূর

দেখতে দেখতে অভিনয় ক্যারিয়ারের ১১ বছর পার করে দিলেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা ফারহান আহমেদ জোভান। আগামী বছরেই তার ক্যারিয়ারের এক যুগ পূর্তি হবে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা চরাই উৎরাই পার করেছেন তিনি। তবে হাল ছাড়েননি। নিজেকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়েছেন, কাজ করে চলেছেন আপন মনে। কদিন বাদেই ঈদ আর তাই এখন বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’-খ্যাত এই অভিনেতা। সম্প্রতি ঈদের কাজ ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সেই আলাপচারিতার চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

সামনেই তো ঈদ। ঈদের আগে ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?

সত্যি বলতে ঈদের ব্যস্ততা এখন অনেক। অনেক কাজের চাপ, যার কারণে কোন বিরতি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি না। আগে তো প্রতিটা কাজের পর একদিন করে হলেও বিরতি নিতাম কিন্তু এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। চেষ্টা করছি একটা না হলেও দুইটা প্রোডাকশনের পর একটু হলে বিরতি নেওয়ার। এরমধ্যে বেশ কয়েকটা কাজ করেছি, আরও অনেকগুলো কাজ বাকি রয়েছে। রোজার মাসটা একদম শরীরের ওপর দিয়ে যাবে। তারপরও আশা করছি বেশ ভালো-ই কাজ আসবে এবার ঈদে।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আপনার অভিনয়েও যথেষ্ট উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইদানিং। গেল ভালোবাসা দিবসেও কিছু কাজ প্রশংসিত হয়েছে। ইমপ্রুভমেন্ট নিয়ে আপনার নিজস্ব অনুভূতিটা কি বা নিজে কতটুকু ফিল করছেন?

নিজের কাজ নিয়ে তো যাচাই-বাছাই করতে পারি না কিংবা সমালোচনা করতে পারি না, কারণ নিজের কাজ নিয়ে সমালোচনা করার মত যোগ্যতা বা ক্ষমতাটা আমার এখনও হয়নি। তবে আমি আমার আশেপাশের মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিই। আমার বন্ধু-বান্ধব, পরিবার এবং দেশ ও দেশের বাইরে আমার যারা ভক্ত রয়েছেন তাদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করি কাজ কেমন হচ্ছে বা কি ধরণের কাজ করা উচিত। আমি সবার মন্তব্যই শুনি তারপর নিজের মত করে সেটাকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করি। আমি বলবো, প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছি একটু অন্যরকম কিছু করার, সেইসাথে নিজেকে ভাঙার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

ঈদকে ঘিরে তো অনেক ব্যস্ততা থাকে, অনেক কাজ করতে হয়। এত কাজের মধ্যে কি কাজের মান বা ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখতে পারেন?

হ্যাঁ, ঈদে আমরা শিল্পীদের অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়, অনেক কাজের প্রেশার থাকে। দেখা যায় যে, ঈদের বাকি দুই মাস এরমধ্যে প্রায় ১৫-২০টা কাজ করতে হয়। প্রত্যেকটা প্রোডাকশন যদি ৩ দিন করে হয় তাহলে দেখা যায় যে সময়টাই আর থাকে না, এরমধ্যে বিশ্রামের সময়টুকুও পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় কাজের মান সবসময় ধরে রাখাটা খুব কঠিনই হয়ে যায়, একটু তো ব্যাঘাত ঘটেই। তারপরও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করি কাজের মান এবং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজটা করার। যখনই অ্যাকশন শুনি তখনই চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গিয়ে পারফর্ম করে ঠিকঠাকভাবে বের হয়ে আসার চেষ্টা করি।

মাঝখানে একটা খারাপ সময় পার করেছেন। এরপর আবার নতুন করে নিজেকে মেলে ধরেছেন, পরিশ্রম করছেন। অভিনয়গুণেই নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। নিজের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কততটা তৃপ্ত?

আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক বেশি তৃপ্ত। এই বয়সে আমি যা পেয়েছি এবং যে অবস্থানে আছি তাতেই অনেক বেশি খুশি এবং তৃপ্ত, সৃষ্টিকর্তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমি এর শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারবো না।

জুটি প্রথা নিয়ে নানান সময়েই কথা ওঠে। এটা নিয়ে কি বলবেন?

জুটিপ্রথা খুবই পজেটিভ বিষয়, এটা নেগেটিভ কিছু না। এটা যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। দর্শক যার সঙ্গে কাজ দেখতে বেশি পছন্দ করে, তার সাথেই জুটি তৈরি হয়। ভিউজ, মন্তব্য কিংবা প্রতিক্রিয়া; এগুলো থেকেই কিন্তু আমরা বুঝতে পারি যে, দর্শকরা আমাদের কাজ পছন্দ করছেন। তখনই কিন্তু একই জুটির কাজ আসে বেশি। এটাকে নেগেটিভলি নেওয়ার কিছু নেই। আমি এটাকে খুব পজেটিভভাবেই দেখি।

একই জুটি নিয়ে বারবার কাজ করতে গিয়ে কখনও একঘেয়েমি কাজ করে না?

একই জুটি নিয়ে বারবার কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি অনুভব হয়, এটা সত্য। এটা অন্যান্য শিল্পীদেরও হয়, আমারও হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রি-টাই তো অনেক ছোট, সেখানে শিল্পীও অনেক কম; তাই ঘুরে ফিরে কয়েকজন শিল্পী নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়। এটাকে নেগেটিভলি নেওয়ার কিছু নেই। এই সীমিত শিল্পী নিয়েই কিন্তু আমরা ভ্যারিয়েশনের মধ্য দিয়ে বিভিন্নরকম চরিত্র প্লে করে যাচ্ছি, এটাই কিন্তু একজন শিল্পীর জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন সবাই ওটিটিমুখী হয়ে যাচ্ছে। অনেকে কাজ করলেও আপনাকে দেখা যাচ্ছে না কেন? ‘মরীচিকা’ সিরিজ নিয়েও আপনি নীরব ছিলেন, সেটাই বা কেন এবং এর পরবর্তীতে আর কোন কাজে পাওয়া যায় নি কেন?

হ্যাঁ, এটা সত্য যে ‘মরীচিকা’ সিরিজ নিয়ে আমি একদমই নীরব ছিলাম। এটার কারণ হলো, এখানে আমি যে চরিত্রটা প্লে করেছি সেটা আমি সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি। আমি হয়তো আরও ভালো পারফর্ম করতে পারতাম কিংবা আরও সুন্দর করে চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে পারতাম। এরজন্য আমি কাউকে দোষারোপ করছি না, এটা আমার নিজেরই দোষ। সত্যি বলতে আমি নিজের প্রতি নিজেই খুব বিরক্ত ছিলাম।

আর অনেকেই এখন ওটিটিতে কাজ করছে কিন্তু আমি যেহেতু নাটকেরই শিল্পী এবং নাটক নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় বেশি তাই এখনও ওয়েবে কাজ করা হচ্ছে না। আর সেখানে সময়ও দিতে হয় অনেক বেশি। নাটকের ব্যস্ততার কারণে সে সময়টা করতে পারছি না। আমার কাছে বেশ কয়েকটা কাজেরই প্রস্তাব এসেছে। স্ক্রিপ্ট পড়ছি, এখনও চূড়ান্ত কিছু বলি নি। ব্যাটে-বলে মিলে গেলে হয়তো কোরবানি ঈদের পর ওটিটিতে কাজ করতে পারি।

আমাদের শিল্পীরা কাজের ক্ষেত্রে কতটুকু নিবেদিত বা পরিশ্রমী বলে মনে হয় আপনার?

আমাদের নাটকের শিল্পীরা প্রত্যেকেই অন্যান্য অনেকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রমী। আমি বলবো তারা তাদের কাজের প্রতি একশত এক ভাগ নিবেদিত এবং পরিশ্রমী। এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। আমরা সবসময়ই বলে আসছি যে, এখানে আমরা মাত্র ২/৩ দিনে যেভাবে একটা কাজ শেষ করি, অভিনয় করি, যতটা এফোর্ট দেই বা পরিশ্রম করি সেটা অন্য কোন দেশের কোন শিল্পীরা করে না। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে কাজটা শেষ করি। ২/৩ দিনে একটা কাজ শেষ করে এরপর কোন বিশ্রাম না নিয়ে পরদিনই আবার নতুন সেটে, নতুন পরিচালক, নতুন জায়গা, নতুন কস্টিউম এবং নতুন চরিত্রে কাজ করতে নেমে যাই। এটা যে কত বড় মানসিক প্রেশার তা বলে বোঝানো যাবে না, তারপরও আমরা হাসিমুখে কাজটা করি। এত মানসিক চাপ নিয়েও কাজটা করি কারণ আমরা অনেক পরিশ্রমী।

মাত্র ২/৩ দিনে একটি ফিকশনের কাজ করতে হয় শিল্পীদের। যেটাকে অনেক শিল্পীরাই সাপোর্ট করেন না। তাদের মতে, কাজের সময় কিংবা পারিশ্রমিক আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

সত্যি বলতে এত কম সময়ে একটি ফিকশন করা আসলেই কষ্টকর বিষয়। তবে আমার গ্রুমিংয়ের শুরু থেকেই আমি দুইদিনে কাজ করে অভ্যস্ত, যার কারণে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। আমাদের সিনিয়র শিল্পীরা আগে ৫/৭ কিংবা ১০ দিনেও কাজ করেছেন। তারা সে সময়টা পেয়েছেন কিন্তু আমরা সেটা পাইনি। তবে আমি অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তেমন সমস্যা হয় না। কারণ, আমি জানি যে, কয়টায় সেটে ঢুকলে বা কয়টায় বের হলে আমি ঠিকঠাক মত কাজটা শেষ করে আসতে পারবো। এ বিষয়ে আমি অভিজ্ঞ বলা যায়।

আর পারিশ্রমিকের বিষয়টা প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্ব বিষয়। কে বাড়াবে বা কে কমাবে সেটা তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটার জন্য তো আসলে কারও অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না আমাদের এখানে। কেউ বাড়াবে মনে করলে বাড়াতেই পারে।

ইন্ডাস্ট্রির প্রতি একজন শিল্পীর দায়বদ্ধতা কতটুকু এবং কোথায়?

প্রত্যেকটা ইন্ডাস্ট্রির প্রতিই প্রত্যেকটা শিল্পীর দায়িত্ব আছে। বলিউডের প্রতি যেমন শাহরুখ খানের দায়িত্ব আছে তেমনি ঢালিউডের প্রতি শাকিব খানের এবং টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির প্রতি আমাদের প্রত্যেক শিল্পীরই দায়িত্ব রয়েছে। একজন প্রটাগনিস্টের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনি একজন পার্শ্ব চরিত্রের শিল্পীরও দায়িত্ব আছে। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা শিল্পীরা অবশ্যই সোচ্চার এবং আমরা জানি ইন্ডাস্ট্রির প্রতি আমাদের দায়িত্বটা কি এবং আমাদের কি করা উচিত! দেখতে দেখতেই এই ইন্ডাস্ট্রিতে ১১ বছর পার করছি। সেই জায়গা থেকে আমি জোর দিয়েই বলতে পারি যে, আমি সবসময় আমার কাজের প্রতি সৎ ছিলাম এবং আছি।

বাংলাদেশ জার্নাল/আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত