রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -৪৫)

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২০, ১১:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

  শাহজাহান সরদার

দেশের জনপ্রিয় দুটি পত্রিকার (যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন) জন্মের পেছনের ইতিহাস, কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া বিব্রতকর বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ, হস্তক্ষেপ, পত্রিকা প্রকাশের ওয়াদা দিয়ে অন্য একটি জনপ্রিয় পত্রিকা থেকে নিয়ে এসে পত্রিকা না বের করে হাতজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় দেয়া, পত্রিকা প্রকাশের পর কোন কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কিছু দিনের মধ্যেই ছাপা সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে লাভ খোঁজা, ইচ্ছেমত সাংবাদিক-কর্মচারি ছাঁটাই করা সহ পত্রিকার অন্দর মহলের খবরা-খবর, রাজনৈতিক মোড় ঘুড়িয়ে দেয়া কিছু রিপোর্ট, সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির কিছু ঘটনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে আমার এ বই ‘রিপোর্টার থেকে সম্পাদক’। জানতে পারবেন সংবাদপত্র জগতের অনেক অজানা ঘটনা, নেপথ্যের খবর।]

(পর্ব -৪৫)

আমার আগের কমিটির সভাপতি ছিলেন আজমল হোসেন খাদেম। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাইফুল আমিন (বর্তমানে চ্যানেল আই-এর বার্তা প্রধান)। তাদের কমিটি দু’টি কম্পিউটার সংগ্রহ করে রিপোর্টারদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ চালু করেছিল। উদ্যোগটি বেশ ভাল ছিল। কিন্তু আমাদের কমিটি যখন দায়িত্ব নিই তখন একটি কম্পিউটার অচল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় আমি কয়েকটি কম্পিউটার সংগ্রহের উদ্যোগ নেই। যোগাযোগ করি তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদের সঙ্গে। আমার কথা শুনে তিনি টেলিফোন করলেন তৎকালীন বিজিএমই সভাপতি আনিসুর রহমান সিনহাকে। বললেন, আমাদের সংগঠনের জন্য কয়েকটি কম্পিউটার দিতে। আমার কথা বললেন। টেলিফোন রেখে তিনি সিনহা সাহেবের নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করতে বললেন। আমি তার রুম থেকে বেরিয়ে যোগাযোগ করলে তিনি জানতে চান কয়টি? বললাম ৪টি হলেই চলবে। আসলে এর চেয়ে বেশি কম্পিউটার রাখার জায়গা আমাদের অফিসে ছিল না। কথামতো তিনি আমাদেরকে কয়েক দিনের মধ্যে ৪টি কম্পিউটার কিনে দেন। এই কম্পিউটারগুলো দিয়ে পরে অনেক রিপোর্টার প্রশিক্ষণ নিয়ে শিখেছেন।

আমার প্রথম মেয়াদের সময় আরেকটি ঘটনা। সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কয়েকদিন পরই আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে। সাথে সাধারণ সম্পাদক মহিদুল ইসলাম রাজু। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসার ছিলেন আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম। বর্তমানে বড় ব্যবসায়ী। তিনি আমার বিশেষ পরিচিত। কাজ শেষ করে ফিরে আসার সময় রাজু সাহেবকে নিয়ে আমি তার রুমে গেলাম। কিছুক্ষণ কথা হলো, রিপোর্টাস ইউনিটির সভাপতি হওয়ায় তিনি আমাকে অভিনন্দিত করেন। আমি বললাম ইউনিটি আছে কিন্তু অফিসে অনেক কিছু নেই। আমাদের কিছু দিয়ে সহযোগিতা করেন। তিনি বললেন, কী প্রয়োজন জানাবেন। সম্ভব হলে ব্যবস্থা করে দিব। বললাম, এই মুহূর্তে একটি টিভি দরকার। তিনি বললেন, কোন সমস্যা নেই। আজই ব্যবস্থা হবে। তার রুমে ওই সময় একজন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। আমি জানতাম না। তাকে বললেন। সাথে সাথে টিভি’র ব্যবস্থা হয়ে গেলো। আগের র‌্যাংগস ভবনের সামনের ওই ব্যবসায়ীর এক শোরুম ছিল, সেখান থেকে বিকালের মধ্যে টিভি নিয়ে রাজু রিপোর্টাস ইউনিটিতে পৌঁছেন।

আমার দুই মেয়াদে এমনি আরো অনেক ঘটনা আছে। সকল রিপোর্টারের মধ্যে ডাইরি ও ক্যালেন্ডার বিতরণ আমরাই শুরু করি। যুক্ত করি অনেক পুরস্কার। তবে একটি ঘটনা বলতেই হবে। ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষে আমারও দ্বিতীয় মেয়াদ। ক্ষমতায় তখন বিএনপি। তিনি বিদায় নেয়ার কয়েকদিন আগে আমি গেলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। উদ্দেশ্য কল্যাণ ফান্ডে কিছু অনুদান সংগ্রহ। মোহাম্মদ হানিফ আমার খুবই ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কিন্তু তিনি মেয়র থাকাকালে এর আগে মাত্র দু’বার আমি তার কাছে গিয়েছিলাম। প্রথমবার মেয়র হওয়ার পর। সে দুই যাত্রা ছিল সৌজন্য সাক্ষাৎ। আমাকে দেখে তিনি বললেন, শাহজাহান ভাই আপনি? তিনি আশ্চর্যই হলেন। আপনিতো এদিকে আসেন না। আমি বললাম, বিশেষ একটি কাজে এসেছি। জানতে চাইলেন, কেন? বললাম, রিপোর্টাস ইউনিটির কল্যাণ ফান্ডে কিছু অনুদান দিতে হবে। তিনি বললেন, শাহাজাহান ভাই এতদিন পরে এলেন। আর দু’দিন আছি। এখন কি ফান্ডে টাকা আছে? তিনি তার একান্ত সচিবকে ডাকলেন। জানতে চাইলেন, তার ঐচ্ছিক তহবিলে টাকা আছে কিনা, থাকলে কত? একান্ত সচিব কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে জানালেন। হানিফ ভাই বললেন, পুরোটা যেন রিপোর্টাস ইউনিটিকে দেয়া হয়। একদিন পর তিনি ইউনিটিতে এসে নিজ হাতে চেক হস্তান্তর করেন। টাকার অংক খুব কম ছিল না।

হানিফ সাহেবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেয়র নির্বাচনের সময় থেকে। নির্বাচনী প্রচারণায় সম্পাদকীয় নীতির কারণেই তাকে সহায়তা করতে পেরেছিলাম। কিন্তু অন্য একটি ঘটনায় তার সঙ্গে আমার হৃদ্যতা বাড়ে। সেটি হচ্ছে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়র হানিফের এক আপনজন সম্পর্কে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর তুলে ধরেন। যা তখন রেডিও-টিভি’তে সরাসরি প্রচার হয়। ঢাকার একটি মার্কেটে কেনাকাটা করতে গেলে কথা কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে এই নেতিবাচক খবর হয় ‘বিএনপি সমর্থিত’ এক পত্রিকায়। আদৌ ঘটনাটি সত্য ছিল না। বেগম জিয়া এভাবে বলার পর আওয়ামী লীগের কেউ প্রতিবাদ না করায় তিনি তার পুত্র, বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাইদ খোকনকে এদিন রাতেই ইত্তেফাক অফিসে পাঠিয়েছিলেন এ অসত্য বক্তব্যের প্রতিবাদ দিতে। আমি হানিফ ভাইয়ের অনুরোধ রক্ষা করেছিলাম। এ কারণেও তার সঙ্গে একধরনের আত্মিক যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সামনাসামনি খুব কমই কথা হতো। কারণ ছিল। তিনি ছিলেন মেয়র। তার এলাকা ছিল এক আর আমার অন্য। আমি নিউজ করতাম সংসদ, প্রশাসন, সরকার নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে। তবে প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার দিন মধ্যাহ্নভোজে তার সঙ্গে দেখা হতো। রাজনীতিতে এমন ভদ্র অমায়িক মানুষের সংখ্যা এখন কম।

ইউনিয়ন, রিপোর্টাস ইউনির্টি নিয়ে আরও অনেক ঘটনা আছে। প্রতিটিই বড়। এসব বিষয়ে আর যাচ্ছি না। সাংবাদিকদের আরেকটি সংগঠনের সঙ্গে আমার যুক্ত হওয়ার ঘটনা দিয়ে শেষ করছি। ইউনিয়ন করার সময় বেশির ভাগ (বামপন্থী) সাংবাদিকের সমন্বয়ে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ইউনিয়ন (আই ও জে) বাংলাদেশ কমিটি। এই কমিটির প্রতিষ্ঠা সভাপতি ছিলেন সংবাদের সাবেক সম্পাদক সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাংবাদিক বজলুর রহমান। বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর স্বামী। এই বজলুর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন। আস্তে কথা বলতেন। ভদ্র-বিনয়ী ছিলেন। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আতিকুর রহমান। তিনি অবজারভারে দীর্ঘদিন রিপোর্টার ছিলেন। পরে দিল্লিতে প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেন। আমাকে করা হয় নির্বাহী সম্পাদক। এই কমিটিতে আবুল কালাম আজাদ (বর্তমানে বাসস-এর এমডি), মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলও (বর্তমানে ইটিভির প্রধান সম্পাদক) ছিলেন। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল তখন ময়মনসিংহের দৈনিক জাহান পত্রিকার রির্পোটার ছিলেন। এই কমিটি গঠনের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ঢাকায় এসে সংবাদে যোগদান করেন।

আই ও জে’র সদর দপ্তর প্রাগ। এখন চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। আগে ছিল চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী। শ্লোভাক প্রজাতন্ত্র পরে আলাদা হয়ে যায়। মূলত মস্কোপন্থী ও প্রগতিশীল সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন এটি। ১৯৯০ সালে প্রাগে একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আমাকে মনোনীত করা হয়। আই ও জে বাংলাদেশ শাখা। সে-সময় দেশের অবস্থা টালমাটাল। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তুঙ্গে। আবার উপসাগরীয় যুদ্ধ। এরই মধ্যে আমি এক সন্ধ্যায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে প্রাগের উদ্দেশে রওনা দেই। তখন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বোম্বে (এখন মুম্বাই) হয়ে লন্ডন চলাচল করে। এই বিমান সংস্থা ঢাকা থেকে এখন আর ফ্লাইট অপারেট করে না। বিজনেস ক্লাসের টিকিট ছিল।

ঢাকা থেকে লন্ডনে নেমে তিনঘণ্টা ওয়েটিং। আবার ফ্লাইট লন্ডন থেকে প্রাগ ফ্লাইট সময় দেড়ঘণ্টা। লন্ডনে পৌঁছে ভিআইপি রুমে অপেক্ষা করতে থাকি। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে মিনিটে মিনিটে ফ্লাইট ওঠানামা করে। তখনও এমন ডিজিটাল যুগ আসেনি। বোর্ডে ফ্লাইটের শিডিউলের সময়সূচি পরিবর্তনের সময় ভীষণ শব্দ হতো। মিনিটে মিনিটেই ওই ধরনের শব্দ। ঢাকা থেকেই প্রাগের বোর্ডিং পাস দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের একঘণ্টা আগে এক ভদ্রমহিলা এলেন আমার খোঁজে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের স্টাফ। পরিচয় হওয়ার পর তাকে ফলো করতে বললেন। আমি তার পেছনে পেছনে বিমানবন্দরের রানওয়েতে পৌঁছি। তিনি আমাকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিলেন। রানওয়ের আঁকা-বাঁকা পথে মাইক্রোবাসটি এগিয়ে চললো। হিথরো বিমানবন্দরের রানওয়েতে প্রায় ১৫ মিনিট চলার পর মাইক্রোবাসটি থামল একটি ছোট ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ফ্লাইটের কাছে। এটি ছোট ফ্লাইট বলে হ্যাংগার থেকে অনেক দূরে রাখা হয়। মাইক্রোবাসে ওঠার সময়ই তিনি আমার বোর্ডিং পাস নিয়ে নেন।

প্লেনের কাছে নামিয়ে সিঁড়ির কাছে আমাকে রেখে তিনি মাইক্রোবাস নিয়ে চলে গেলেন। যাত্রীরা প্লেনে উঠছেন। আমি সিঁড়ি বেয়ে গেটের কাছে যেতে বোর্ডিং পাস চাইলেন কেবিন ক্রু। আমি এ পকেট ও পকেট হাতিয়ে আর বোর্ডিং পাস পাই না। হঠাৎ মনে হলে ওই মহিলা নিয়েছিলেন। তিনি দিয়ে যাননি। আমি কেবিন ক্রুকে বললাম। তিনি বললেন, বোর্ডিং পাস লাগবে। আমি ঘামতে লাগলাম। অন্য যাত্রীরা উঠছেন। কথা বলার সুযোগ কম। আমি গেটের এক পাশে দাঁড়ানো। এখন কী করা? মহিলার নাম-পরিচয় কিছু জানি না। এখান থেকে নামিয়ে দিলে কী হবে ইত্যাদি। অধিকাংশ যাত্রী উঠে গেলে আমি জানতে চাইলাম তোমাদের এই ফ্লাইট কি ফুল। অর্থাৎ সব আসনে যাত্রী আছে কিনা? তিনি বললেন হ্যাঁ। আমি তখন বললাম, পূর্ণ হয়ে থাকলে আমার আসন তো শূন্য থাকবে। মহিলা ব্রিটিশ। ভদ্রতা জ্ঞান আছে। আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। একটি ব্যাগ নিয়ে সেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি, যে যাত্রীই যাচ্ছেন তার শরীরে ব্যাগটি লাগছে। এক বিশ্রী অবস্থা। এর মধ্যে কেবিন ক্রু মহিলার কাছে তালিকাও এসে গেছে। যাত্রীরাও বসে গেছেন। আসন একটি শূন্য। নামও ঠিক আছে। আমাকে নিয়ে বসানো হলো শূন্য আসনে। আমর জামাকাপড় শীতাতপের মধ্যেও ঘেমে পুরো ভেজা। দেড়ঘণ্টার ফ্লাইটেও আমার ঘাম শুকোয়নি।

আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ অবস্থা হলে নির্ঘাত ফ্লাইট থেকে নামিয়ে কয়েকঘণ্টা আটকে জেরা করা হতো। জীবনে এই প্রথম ফ্লাইট বিড়ম্বনায় পড়ি। এরপর আরো বহুবার। প্রাগ থেকে ফেরার সময় অভিজ্ঞতা আরো ভয়াবহ। ফেরার পথও ছিল বোম্বে হয়ে ঢাকা। তবে বোম্বে আমি একদিনের জন্য স্টপেজ নিয়েছিলাম। সেভাবেই টিকিট আসে। প্রশিক্ষণ-শেষে নির্ধারিত দিনে বোম্বে পৌঁছি সকালে। হোটেল ঠিক করা ছিল আগেই। লম্বা জার্নি শেষে হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। উঠি দুপুরে। এরপর ট্যাক্সি নিয়ে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা। কিছু কেনাকাটা। পরদিন সকালে আবার ফ্লাইট। তাই শেষ রাতে হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি অনেক যাত্রী জটলা করছে। এর মধ্যে বাঙালি আছে বেশ ক’জন। জটলা থেকেই শুনলাম ফ্লাইট বাতিল।

বোম্বে-ঢাকার ফ্লাইট যাচ্ছে না। উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে তখন বিশ্বব্যাপী ফ্লাইট শিডিউল লণ্ডভণ্ড। আদৌ এই ফ্লাইট যাবে কিনা, গেলে কবে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। ব্রিটিশ এয়ারওয়জের কাউন্টারে কেউ নেই। মহাসমস্যায় যাত্রীরা। শুধু ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ নয়, অন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোরও একই অবস্থা। যত সময় গড়াতে থাকে যাত্রীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিশৃংখল অবস্থা। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ পর একজন এসে আমাদের জানান, পরদিন একই সময়ে ফ্লাইট আসতে পারে। এ আশ্বাসের মধ্যেই ফিরে যাই আবার হোটেলে। সাধারণত হোটেল বুকিং দুপুর ১২টা থেকে পরদিন ১২টা। আমি তো হোটেল ছেড়ে গেছি তাই আবার নতুন করে বুক করতে হবে। হোটেলে ফিরে ফ্লাইট বাতিলের কথা জানালে কর্তৃপক্ষ আমার আগের বুকিং-ই বহাল রাখে। এর মধ্যে চিন্তায় পড়ে যাই। বাসার সবাই চিন্তা করবে। গাড়ি হয়তো বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছে। কীভাবে খবর পাবে। হোটেল থেকে বাসায় ফোন করলাম। কেউ ফোন ধরলো না। মনে করি নিশ্চয়ই বিমানবন্দরে স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষা করছে। কিন্তু খবর দেয়ার সুযোগ নেই। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না। পরে রাতে বাসায় ফোন করে শুনেছি স্ত্রী-সন্তানরা বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে বাসায় ফিরেছে দুঃশ্চিন্তা নিয়ে। কেননা ঢাকায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ শুধু জানিয়েছে ফ্লাইট বাতিল। কবে, কখন আসবে তা বলতে পারেনি। আসলে বলার মতো ছিল না।

বোম্বে আরো তিনদিন অপেক্ষা করে আমি তা দেখেছি। পরদিন সকালে আবার বোম্বে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একই অবস্থা। সেই পুরোনো যাত্রীরা সাথে কিছু নতুনও আছে। বাঙালিরাও আছে। এর মধ্যে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হোসেন আবেদও ছিলেন। ফ্লাইট কবে থেকে চালু হবে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছিলো না। জটলার মধ্যে কে একজন বললেন, বোম্বে থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কলকাতা হয়ে ঢাকা যাওয়া যেতে পারে। আর দেরি নয়, আমিসহ কয়েকজন সেখান থেকেই বোম্বে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে পৌঁছাই। এখানে দেখি আরও হৈ-চৈ। এই বিমানবন্দর এমনিতেই খুব ব্যস্ত। ভারতের সকল বিমানবন্দরে এখান থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এমনিতেই ভিড়। এর ওপর আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রী। ফজলে হোসেন আবেদ সাহেব আমার আগেই পৌঁছেছিলেন। আমি দেখি দীর্ঘ লাইনে তিনি ব্যাগভর্তি ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বোম্বে থেকে কলকাতা দিনে তখন দুইটি ফ্লাইট ছিল। একটি আগেই চলে গেছে। আরেকটির জন্য লাইন। আমিও দাঁড়ালাম। সামনে গিয়ে আবেদ সাহেবের সাথে কথা বললাম। তার প্রথম শ্রেণির টিকিট তাই অগ্রাধিকার। এয়ার ইন্ডিয়ার এক কর্মী চেষ্টা করে আবেদ সাহেবকে কলকাতা আসার ব্যবস্থা করলেন। আমি ছিলাম লাইনের প্রায় শেষ মাথায়। আমার আসার ব্যবস্থা হলো না। এয়ার ইন্ডিয়ার ওই কর্মী জানালেন পরদিন ব্যবস্থা করে দেবেন। বললেন, তোমার প্রথম শ্রেণিতে টিকিট আছে। তুমিও অগ্রাধিকার পাবে। তবে বুকিংয়ের সব যাত্রী এলে কিছুই করার থাকবে না। বিকাল পর্যন্ত বিমানবন্দরে ব্যাগভর্তি ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সেদিন আসা হলো না।

বিমানবন্দরের কাছাকাছি হোটেলে উঠলাম। রাতে কোনরকমে কাটিয়ে আবার সকালে বিমানবন্দরে। গিয়ে শুনি সকালের ফ্লাইট বাতিল। এবার বিকালের জন্য অপেক্ষা। সকালের যাত্রীরাও অপেক্ষা করছেন। এয়ার ইন্ডিয়ার সেই কর্মীর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, অপেক্ষা করেন। ট্রলি নিয়ে দাঁড়িয়েই আছি। বিকালের ফ্লাইটেও জায়গা হলো না। কারণ ওই ফ্লাইট সকালে বাতিল হবার ও বিকালে বুকিংয়ের সব যাত্রীই বহন করতে পারেনি। আর আমাদের অবস্থান হলো চান্সের যাত্রী। সেদিনও আসা হলো না। এর মধ্যে বাসায়ও যোগাযোগ নেই। আসলে বিমানবন্দরে বিমানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নিজেই হয়রান হয়ে যাই। তিনদিন অপেক্ষার পর চতুর্থ দিন বোম্বে থেকে কলকাতা পৌঁছতে সক্ষম হই। এ-দিন বড় ফ্লাইট দিলেও অপেক্ষমাণ অনেক যাত্রীর স্থান হয়নি। কলকাতা থেকে বাসায় যোগাযোগ হলে স্ত্রী-সন্তানদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটে। দু’দিন কলকাতায় অবস্থানের পর ঢাকায় ফিরি। ভ্রমণে এ-ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আরও হয়েছে। এসব নিয়ে এই গ্রন্থে আর লিখতে চাই না। ভবিষ্যতে ভ্রমণকাহিনীর জন্য এগুলো রেখে দিলাম।

চলবে...

বইটি পড়তে হলে সপ্তাহের রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতিবার চোখ রাখুন ‘বাংলাদেশ জার্নাল’ অনলাইনে।

বইটি প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশন

আজিজ সুপার মার্কেট (তৃতীয় তলা), ঢাকা।

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই