ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

কারখানায় আগুনে ৭ বছরে ৭২৪ শ্রমিকের মৃত্যু

  ফরহাদ উজ্জামান

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৫:৪৭

কারখানায় আগুনে ৭ বছরে ৭২৪ শ্রমিকের মৃত্যু
পুড়ছে হাসেম ফুড কারখানা (ফাইল ছবি)
ফরহাদ উজ্জামান

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডসের একটি কারখানায় আগুনে বহু হতাহতের ঘটনাটি হৃদয় স্পর্শ করে দেশের মানুষের। এরপর শিল্প কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও উত্তর মেলেনি। গেল কয়েক দশকে দেশে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতায় একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি। আবার দুএকটি ক্ষেত্রে মামলা হলেও সাজার নজির নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ীদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মামলার পর নানামুখী চাপে আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও কিছু দিন পর জামিন নিয়ে তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে নিয়মনীতি না মানা ও নজরদারি না থাকার অভিযোগ এসব কারখানার বিরুদ্ধে। মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে এসব শিল্প কারখানায় কাজ কার শ্রমিকরাই আগুনে বেশি মারা গেলেও তা দেখার কেউ নেই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বিভিন্ন সংস্থার হিসাব মতে, দুই দশকে বাংলাদেশে শিল্পকারখানার দুর্ঘটনায় দুই হাজারের মতো শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে গত ৭ বছরেই মারা গেছেন ৭২৪ জন মানুষ। ২০২১ সালে আগুনের ঘটনায় ১৪২ জন মারা যান যার বেশিরভাগই শ্রমিক।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, ২০১৫ সালে আগুনের ঘটনা ছিল এক হাজার ১৩টি। নিহত হন ৬৮ জন। ২০১৬ সালে এক হাজার ১৬৫টি আগুনের ঘটনায় মারা গেছেন ৫২ জন। ২০১৭ সালে ১ হাজার ১৯টি শিল্প কারখানার আগুনে মারা যান ৪৫জন। ২০১৮ সালে এক হাজার ১৩১টি দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে মারা যান ১৩০জন। ২০১৯ সালে ৯৯৭টি আগুনের ঘটনায় মারা যান ১৩৪জন। ২০২০ সালে ৭৫৬টি আগুনে ১৫৩জন মারা যান।

শুধু ২০২১ সালে আগুনের ঘটনায় ১৪২ জন মারা যান। এর মধ্যে ৫৭ জন পুরুষ ও ৮৫ জন নারী। তবে এসব আগুনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কোন আহত বা নিহত নেই। সব মিলিয়ে গত ৭ বছরেই মারা গেছেন ৭২৪ জন মানুষ। যার বেশিরভাগই শ্রমিক।

এবিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদ-উল ইসলাম খান বাংরাদেশ জার্নালকে বলেন, বেশিরভাগ মালিকের কাছেই কারাখানার শ্রমিকদের জীবনের কোনো দাম নেই। দুর্ঘটনায় তাই কর্মক্ষেত্রেই প্রাণ দিতে হয় নিরীহ শ্রমিকদের। কারখানার সব কিছু ঠিক আছে কি নাই এটি দেখার দায়িত্ব কার? এটা মালিক দেখবে। শ্রমিক না। জীবনের মূল্য কখনও টাকা দিয়ে হয় না।

পোশাক খাতের চেয়ে অন্য শিল্প কারখানার অগ্নি দুর্ঘটনা বাড়ছে

মৃত্যুর হিসাবে গত এক দশকে তাজরীন ফ্যাশনসের পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শিল্প কারখানার অগ্নি দুর্ঘটনা হল হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানার আগুন। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসের আগুন এবং পরের বছর রানা প্লাজা ধ্বসের পর পোশাক খাতের কারখানাগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। এক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর মালিকদের সঙ্গে অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্স এবং কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর একত্রে কাজ করেছে।

২০১৮ সালের পর থেকে পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড এবং মৃত্যু অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের বেশিরভাগ ঘটনাই পোশাক খাতের বাইরে শিল্প কারখানায়।

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর মধ্যে মাত্র ৪ টি ঘটনায় মামলা হয়। এর মধ্যে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত শেষে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়া হলেও বিচার কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। আর চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি ও বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়নি। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ৫২ জন শ্রমিক মারা গিয়েছিল। এঘনায় হত্যা মামলা দায়ের হয়। পরে মালিকসহ ৮ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তবে এ মামলার ও তদন্তকাজ শেষ হয়নি। প্রতিটি মামলায়ই বেশিরবাগ আসামিরা জামিনে আছেন।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় ভয়াবহ আগুনে অন্তত ১১২ জনের মৃত্যু ও দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হন। ওই দুর্ঘটনায় মামলা হলেও আজও বিচার শেষ হয়নি। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের প্রাণহানির পর অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা করার মধ্যেই আইনি প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রয়েছে। দুই বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি।

২০১৯ সালের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ২৫ জন ও পরে এক জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উদ্ধারকর্মী ফায়ারম্যান সোহেল মারা যান। এ ঘটনায় বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মিল্টন দত্ত একই বছরের ৩০ মার্চ বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলার তদন্তও শেষ হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সহসভাপতি আবু বকর ফরহাদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের মামলায় দোষীদের যথাযথ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কারখানাগুলোয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের নেতা মোশরেফা মিশু বলেন, অতি লাভের আশায় মালিকপক্ষ অগ্নিনির্বাপক বা সুরক্ষার দিকে তেমন কোনো নজর দেন না। তাদের অবহেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। নানামুখী চাপে দু-একটি ক্ষেত্রে মামলা হলেও সাজার কোনো নজির নেই। তিনি বলেন, উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজার নজির সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে শ্রমিকদের জীবনের সুরক্ষার দিকে মালিকরা নজর দেবেন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানাগুলোর বেশিরভাগই নজরদারির বাইরে রয়েছে। আর ছোট-বড় আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। কমিটি প্রতিবেদনও দেয়। তবে সে অনুযায়ী কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফলে বার বার দুর্ঘটনার বলি হন নিরীহ শ্রমিকরা।

এ বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক ফরিদ আহমেদ বলেন, পরিদর্শন একদমই যে হয় না, তা নয়। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। আমাদেরকে ওয়ার্কারদের কিছু ব্যক্তিগত অভিযোগ অ্যাটেইন করতে হয়।

তিনি বলেন, আমাদের জনবল ছিল ৩৩৩ জন, এরপরে ৯৩৩ জন হয়েছে। কিন্তু আমাদের রাইজের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের শিল্পখাতের উন্নয়ন বা কমার্শিয়াল এন্টারপ্রাইজের ডেভলপমেন্টটা আরো দ্রুত হচ্ছে। আমরা দ্বিতীয় পর্যায়ে ২ হাজার ৭৮০ জন জনবল চেয়ে জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এছাড়া আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেইফটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব রেখেছি।

ভয়াবহ সব অগ্নিকাণ্ড কিন্তু মামলা হয়নি: ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মিরপুরের সারেকা গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন পুড়ে মারা যান। ১৯৯৫ সালে ঢাকার ইব্রাহিমপুরের লুসাকা অ্যাপারেলসে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন কর্মী প্রাণ হারান। ১৯৯৬ সালে ঢাকার তাহিদুল ফ্যাশনে ১৪ জন এবং সিনটেক্স লিমিটেডের কারখানায় ১৪ জন পুড়ে মারা যান। ১৯৯৭ সালে মিরপুরের তামান্না গার্মেন্টে ২৭ জন এবং মিরপুর-১নং মাজার রোডের রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলসে আগুনে ২২ শ্রমিক মারা যান। ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেডে আগুনে ৫৩ শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে।

২০০০ সালে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়িতে গ্লোব নিটিং ফ্যাশন লিমিটেডে ১২ শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডে মারা যায়। ২০০১ সালে মিরপুরের মিকো সোয়েটার লিমিটেডে আগুনের গুজবে পদদলিত হয়ে ২৪ শ্রমিক মারা যান। ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে সান নিটিং গার্মেন্টে আগুনে ২০ শ্রমিক মারা যান। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গুদামে ভয়াবহ আগুনে শিশুসহ ১২৫ জনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার একটিতেও মামলা হয়নি। দায়ীরা সবাই রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এবিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দিনমনি শর্মা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, শিল্প কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা আগের চেয়ে কমে গেছে।

প্রতিবছরই আগুনে এতো মানুষের মৃত্যুতে মালিকদের গাফিলতি থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তো সেবা দেই। বিচার করা বা আইনি ব্যবস্থা নেয়া আমাদের কাজ নয়। অগ্নিকাণ্ডের পর আমরা তদন্ত প্রতিবেদন দেই। দোষীদের ব্যবস্থা যারা নেবে বিষয়টি তারা বলতে পারবে। তবে যেকোনো অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত সেবা দিয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে শিল্প কারখানা স্থাপনে নিয়ম-কানুন আর বিধি-বিধান থাকলেও কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারাখানা মালিকপক্ষ সেটি অমান্য করেছে। অতি লাভের আশায় মালিকপক্ষ অবহেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। আর সেই সাথে সামনে আসে কর্তৃপক্ষের নজরদারির অবহেলার বিষয়টিও। নানামুখী চাপে দু-একটি ক্ষেত্রে মামলা হলেও সাজার কোনো নজির নেই। উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজার নজির সৃষ্টি করতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত