ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ আপডেট : ২ মিনিট আগে
শিরোনাম

আত্মহত্যারোধে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ

  গাজী কাইয়ুম

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:৫০  
আপডেট :
 ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৭:১৯

আত্মহত্যারোধে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
নিজস্ব ছবি
গাজী কাইয়ুম

কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে৷ শুধু শিক্ষার্থী নয়, সর্বস্তরের মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে৷

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে এ বছরের প্রথম আট মাসে আত্মহত্যা করা তিনশ ৬৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে একশ ৯৪ জন (৫৩ দশমিক ৩০ শতাংশ) স্কুলের৷ কলেজ শিক্ষার্থী ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং মাদ্রাসার ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ৷ ২০২১ সালে ছাত্রীদের চেয়ে ছাত্রদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি ছিল৷ আর নতুন তথ্য বলছে, ছাত্রীদের মধ্যে এই হার বেশি৷ এবছর আত্মহত্যা করা ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশই (২২১ জন) ছাত্রী৷ বাকি ১৪৩ জন ছাত্র৷

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে উঠে এসেছে, ২০২১ সালে দেশে একশ একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন৷ ২০১৮ সালে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ১১জন এবং তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ১৯জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন৷ ২০২০ সালে দেশে ৪২জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন৷ আর চলতি বছরের ৮ মাসেই আত্মহত্যা করেছেন ৫০ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী৷

সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত তার 'সুইসাইড' গ্রন্থে আত্মহত্যার জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে সামাজিক কারণগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মতে, আত্মহত্যা একটি সামাজিক ঘটনা। তিনি মূলত সামাজিক সংহতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আত্মহত্যাকে সম্পর্কিত করে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ডুর্খেইম বলেন, যারা সমাজের সঙ্গে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত, তারা আত্মহত্যা করে। আবার যারা সমাজ থেকে অতিমাত্রায় বিচ্ছিন্ন, তারাও আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যা মহাপাপ। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। পৃথিবীর সব ধর্মে এবং নৈতিকতায় আত্মহত্যার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। যদি আমরা আত্মহত্যার পেছনের গল্পটি দেখি, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই যে চিত্রটি মনে আসে, তা হলো যৌতুক, বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ, প্ররোচনা, চাপ, হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা, চাহিদা এবং আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য, নেতিবাচক চিন্তাভাবনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীনতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি প্রভৃতি।

আত্মহত্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সাইকোথেরাপি, ইতিবাচক মনোভাব, সহানুভূতি, বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করা, কথা বলার ও আবেগ ভাগাভাগি করার পরিবেশ তৈরি করা এবং আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এখনই পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরবর্তী সময়ে আমাদের অনুশোচনা করতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা যদি তাদের শেখাতে পারি, ভালো-মন্দ যাই ঘটুক না কেন, সেটা জীবনেরই অংশ এবং আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে তাদের ধৈর্যশীল হতে হবে, তাহলে এ শিক্ষার্থীরা যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বাস্তবমুখী কিছু জ্ঞান যেমন- আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি আত্মহত্যা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং আত্মকর্মসংস্থান তৈরি, কমিউনিটি ও পরিবারের সহায়তায় হতাশামুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করতে এখনই সবার এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সবার সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা কমানো সম্ভব।

আত্মহত্যা রোধ করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব এবং এর প্রতিরোধে আমি-আপনি সবাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। কারও জীবনের কঠিনতম সময়ে আমাদের কর্মের মাধ্যমে সমাজের সদস্য হিসাবে, বাবা-মা হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে, বন্ধু হিসাবে, সহকর্মী বা প্রতিবেশী হিসাবে অবদান রাখতে পারি। যারা আত্মঘাতী হওয়ার মতো সংকটে ভুগছেন, তাদের সহায়তায় আমরা সবাই ভূমিকা রাখতে পারি। তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি-সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজ জীবনের জন্য যা অপরিহার্য।

লেখক: সাংবাদিক

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত