ঢাকা, শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে
শিরোনাম

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়

  ড. জান্নাতুল ফেরদৌস

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৯:৫৮

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়
নিজস্ব ছবি
ড. জান্নাতুল ফেরদৌস

বিশ্ববিদ্যালয় হলো সেই প্রতিষ্ঠান যেখানে মানবতাবাদ, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা, সত্যানুসন্ধান, নতুন নতুন জ্ঞান অন্বেষণ, গবেষণা, দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা, ইচ্ছা ও বুদ্ধির মুক্ত চর্চা সদগুণ এবং মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের শিক্ষা দেয়া হয়। প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। শিক্ষার্থীদের বৃহৎ একটি অংশ যুক্ত আছেন এমন বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। আবার অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, ক্লাব বা সংগঠনে কাজ করা মানে সময় নষ্ট, পড়ালেখার ক্ষতি।

বস্তত, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে মেলে ধরার সময়। সেই সাথে নতুন নতুন দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা অর্জনেরও গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি।

একজন শিক্ষার্থীর অর্জিত ডিগ্রি ও ভালো সিজিপিএ ক্যাম্পাস পরবর্তী জীবনে ক্যারিয়ার গঠনে সহায়তা করবে। তবে ক্লাস রুমের বাইরে অর্জিত জ্ঞান একজন শিক্ষার্থীকে সারা জীবন চলার পথে রসদ জোগায়। তাই বর্তমান তুমুল প্রতিযোগিতার যুগে ভালো ক্যারিয়ার গঠনে পড়াশোনার পাশাপাশি কো-কারিকুলামের বিকল্প নেই।

অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শুধুই পাঠ্য বইয়ের মলাটে আর ইট-পাথরে ঘেরা চার দেয়ালের ক্লাস রুমে আবদ্ধ না করে ক্লাসের বাইরের জগৎ থেকেও নানান অভিজ্ঞাতা আর শিক্ষা নিয়ে জীবনকে ভিন্ন আঙ্গিকে সাজাতে হবে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে একজন তরুণ নিজেকে বিকাশের সুযোগ পান। এখানে নেতৃত্বের গুণাবলির চর্চা হয়, পাশাপাশি শেখানো হয় লেখালেখির কৌশল, সাংস্কৃতিক আড্ডা, উপস্থাপনার কৌশল ইত্যাদি। তাই বর্তমানে চাকরির বাজারে নিজেকে দক্ষ কর্মী হিসেবে প্রমাণ করতে চাইলে অবশ্যই ছাত্রজীবনে কোনো না কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেকে এগিয়ে রাখতে হবে সবার চেয়ে।

এছাড়াও একজন শিক্ষার্থীর বিশেষ কিছু দক্ষতা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মোড়ক হিসেবে কাজ করে। যেগুলো পরবর্তী চাকরি জীবন এমনকি পুরো জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সেরকম কয়েকটি বিষয় নিম্নে তুলে ধরা হল।

বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন

অভিজ্ঞতায় আলোকিত ব্যক্তি কখনো কর্মী, কখনো পাঠক, কখনো শ্রোতা, কখনো আবার চিত্রশিল্পের সমঝদার। অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান আর প্রবহমানতা দেশ-কালের সীমানা মানে না। প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে, গুরুত্বপূর্ণ বা বিশেষ, সমস্ত অভিজ্ঞতা প্রায় হস্তান্তরযোগ্য। নানাবিধ কর্ম এবং নতুন পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংগঠনিক দক্ষতা একজন শিক্ষার্থীকে অভিজ্ঞতার আলোকে আলোকিত করে তোলে।

কারণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার যুক্তি পৃথিবীব্যাপি চালকের আসনে থাকে। একজন মানুষের সমস্ত কিছু কেড়ে নিলেও অভিজ্ঞতা তার মননের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছিনিয়ে নেয়া অসম্ভব। তাই মানুষ প্রধানত অভিজ্ঞতাকে কর্মে তথা শিল্পে রূপান্তরিত করে- যে উপায়ে তার ছড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। আর সংগঠনগুলো এসকল বাস্তব সংমিশ্রণে পরিচালিত হয় বিধায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর একাডেমিক শিক্ষার বাহিরে কোন না কোন সংগঠনে সম্পৃক্ত থাকা আবশ্যক।

নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধি

শিক্ষাজীবনে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী কাজসমূহ একজন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, পেশা, মননশীল মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিতে প্রবেশের পরে কাজের চাপে চাইলেও অনেক কিছুই করা যায় না। ভলান্টিয়ারিং করার সময় কাজের চাপ খুব বেশি থাকে না, পরিবেশও থাকে বন্ধুসুলভ। অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে বস ও অন্যান্য কলিগদের এক্সপেক্টেশন মেটানোর একটা বিষয় থাকে। টার্গেট পূরণের বিষয় থাকে। এই চাপটা ভলান্টিয়ারদের উপরে কম থাকে।

তাই ভলান্টিয়ারিং করতে গিয়ে নেটওয়ার্কিং করার একটা সুযোগ তৈরি হয়। ভলান্টিয়ারদের বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষের সাথে ইন্টারঅ্যাকশনের সুযোগ থাকে। প্রায় সবাই-ই ভলান্টিয়ারদের বেশ গুরুত্ব দেয়। নিজের কাজটা ঠিকমত গুছিয়ে করতে পারলে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের চোখে পড়াটাও সহজ। তাই ভলান্টিয়ারিং আপনাকে কোনো চাপ বা এক্সপেক্টেশন ছাড়াই নতুন মানুষজনের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেবে।

মানবিক মানুষ হওয়া

মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা সাম্প্রতিক সময়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় এ ধারার চর্চা অনেক বেশি ক্রমবর্ধমান। শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি ক্ষমতার সমৃদ্ধি কিংবা নিছক লালসায় মানবিকতাকে বিকিয়ে দিচ্ছে। আতংকের বিষয় হলো এতে শিক্ষার্থীদের লেলিয়ে দেবার মত অভিযোগ উঠেছে অবিভাবকের জায়গায় থাকা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। সত্য মিথ্যার বিবেচনায় না গিয়ে এ ধারণা থেকে অবুঝ শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলোকে আরও বেশি উদ্যমী করা প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতে পারলে কিংবা বিভিন্ন দুঃসময়ে অগ্রণী ভূমিকায় থাকলে মানবিকতা চর্চা বহাল থাকে। কারন আমার দেখছি, প্রেম-ভালোবাসা ও দয়া-মায়া, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। আমরা কিন্তু মানবীয় গুণাবলি হারিয়ে ক্রমেই মানুষ হিসেবে নয়, ক্রমেই হিংস্র প্রাণীর মতো নিষ্ঠুর আচরণ করছি। এমন কেন হচ্ছে? সময়ের আবর্তনে সভ্য মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে মানবতাবোধ যেখানে বৃদ্ধি পাবার কথা, সেখানে মানবতবোধ কমছে, প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? শিক্ষিত মানুষের মধ্যে মানবীয় গুণাবলি আরও বেশি থাকার কথা, তা কিন্তু এখন আর তেমন দেখা যাচ্ছে না।

কাজেই একজন মানবিক মানুষ হতে গেলে মানবিক কাজে নিজেদের জড়িয়ে রাখার বিকল্প নেই। এতে সমাজের সম্প্রীতি স্থিতিশীল থাকবে।

উচ্চ শিক্ষায় বাড়তি সুবিধা

ভর্তির আবেদনের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সামাজিক দক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে একজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার ফলে এই যোগ্যতাটুকু সহজেই আত্মস্থ করতে পারেন। একইসাথে এটি শিক্ষার্থীদের অধিক যোগ্য হিসেবে বিবেচিত করবে।

এ জন্য দেশে স্কুল ও কলেজে পড়ার সময়ে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে যুক্ত হওয়া যায়। সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিতর্ক, নৃত্য সংগঠন, গণিত অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন মেধাবৃত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ভর্তি কার্যক্রমে দারুণ সহায়তা করে। স্কাউটিং, সামাজিক বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সনদও এসব ক্ষেত্রে আপনাকে এগিয়ে রাখবে।

যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন

যেকোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠা ও রক্ষায় যোগাযোগের ভূমিকা অপরিসীম। ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নের বিকল্প নেই।

অর্থাৎ আপনি কীভাবে অন্য একজন ব্যক্তির কাছে সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন তা নির্ভর করে আপনার যোগাযোগ দক্ষতার ওপর। কথাবার্তা, আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি নিজেকে কতটা আকর্ষণীয় করে তুলবেন অন্যদের কাছে। তবে যোগাযোগ দক্ষতা বলতে শুধু নিজেকে অপরের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনকেই বোঝায় না, বরং অপরপক্ষ কী বলতে বা বোঝাতে চাচ্ছে তা সঠিকভাবে বুঝতে পারাও বটে। যোগাযোগ একটি দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া। এই দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার ক্ষমতাই হলো যোগাযোগ দক্ষতা। ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে যোগাযোগ দক্ষতায় উন্নতি করা সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে একজন শিক্ষার্থী সংগঠক সম্পূর্ণভাবে নিজের যোগাযোগ দক্ষতাকে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। সংগঠনসমূহের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে নানা স্তরে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হয়৷ একইসাথে ছাত্র-শিক্ষক, সামাজিক স্তরে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পান। যেটি একজন শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনে গুরুত্ব বহন করে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত