ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ৪২ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২১, ১৯:৩৪

প্রিন্ট

করোনাকালের গল্প ‘হাঁচির খাজানা’

করোনাকালের গল্প ‘হাঁচির খাজানা’
প্রতীকী ছবি।। সংগৃহীত

মোস্তফা কামাল পাশা

শানদার ডাইনিং হল। বিশাল! ১২শ’ স্কয়ার ফিট। চোখ ধাঁধানো ইন্টেরিয়র। নগরীর অভিজাত এলাকায় দু’বিঘা জমির মাঝখানে ডুপ্লেক্স বাড়ি। নিচতলায় ড্রয়িং ও ডাইনিং হল। বাড়ির মোট আয়তন ৭৫০০ স্কয়ার ফিট। দেশি-বিদেশি বাহারি গাছ, ফুল, ফল ও অর্কিডে সুসজ্জিত বাগান ঘেরা। বাগানে আছে মিনি সুইমিংপুল। পুল সাইড ও বিশ্রাম শেড পুরোই গ্রানাইট পাথরে তৈরি। ঝকঝকে-তকতকে। পিছলে পড়ে চাঁদের আলো-সূর্য কিরণ।

আটফুট উঁচু নিরাপত্তা দেয়ালে ঘেরা। দেয়ালের উপরে কাঁটাতারের বেড় ও গাছপালার আড়াল থাকায় সহজে কারো চোখে পড়ে না। বাড়ির ছোট মেয়ের জন্মদিন ৮ জুলাই। করোনা অতিমারির ভয়াল মৃত্যুথাবার ঘেরাটোপে! নামি স্কুলে ‘ও’ লেভেলে পড়ে ইভা। তিন ভাইবোনের সবার ছোট। ১৫ তে পা দেবে। কঠিন করোনা লকডাউনে ইভা জন্মদিন অনুষ্ঠান করতে একদম রাজি না।

বাপকে বলে, ‘বাপি, য়্যু নো ন্যাশন পাসিং ক্রুসিয়াল টাইম। ডেথ টোলস আর হরিবল। প্লিজ ড্রপ দ্য সেলিব্রেশন। বেটার য়্যু সুড রিহেবিলিটেট করোনা অ্যাফেক্টেড জবলেস ফিফটি ফেমিলি বাই দ্য অ্যামাউন্ট।’

কথা শেষ হতেই বাপকে সুযোগ না দিয়ে ঝামটা মেরে কেড়ে নেন মা, ‘চুপ যা, য়্যু রাবিশ মাদার তেরেসা! এসব পচা কথা শিখেছিস কোথায়? কে মাথায় পোকা ঢোকালো তোর?’

‘পচা কেন হবে মম? দেখছো না, কত মানুষ কষ্ট পাচ্ছে! সামনের বছর না হয় স্টেটস এর ডিজনিল্যান্ডে আরো মজা করে করবো।’ ইভা আত্মপ্রত্যয়ের সাথে থামাতে যায়।

কাম ডাউন বেবি, কাম ডাউন, বাপি থামিয়ে দেন ইভাকে। ছোট আয়োজন হবে। সামনের বছর তোমার ইচ্ছেমত ডিজনিল্যান্ডও ঠিক থাকবে।

অনেক চেষ্টায়ও বাবা-মা’কে রাজি করাতে না পেরে মন খারাপ ইভা চুপচাপ দাদুর রুমে চলে যায়। বৃদ্ধ দাদুটা বড্ড একা। খাবার-দাবার, ওষুধ দেয়া হয় ঠিকমত, কিন্তু দেখভালের কেউ নেই। নামে একজন আয়া রাখা হলেও তিনি মায়ের খেদমতগার হয়ে গেছেন। ঘড়ির কাঁটা ধরে ভাত-নাস্তা ঠেলে দেয়া হয়, কিন্তু ঠিকমত রুমটাও সাফ করা হয় না। দাদুর কথা কারো মনেই থাকে না। তিনিও চুপচাপ পড়ে থাকেন। হাটতে-চলতেও কষ্ট। অনলাইন ক্লাস বা কোচিং শেষে ইভা কিছু সময় দেয় দাদুকে। হুইলচেয়ারে বেলকনিতে নিয়ে যায়। গ্রামের গল্প শুনে, দাদুর বিছানা রুমও গুছিয়ে দেয় মায়ের অগোচরে। মা জানলে ইভাকে বকা দেয়ার নামে অকথা-কুকথা বলে দাদুকে ধুয়ে দেবেনই।

ইভার বাবা পাহলভি সাহেব ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট শীর্ষ কর্পোরেট গ্রুপ প্রধান। দৃশ্য-অদৃশ্য অসংখ্য ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক। বিদেশেও হরেক রকম ব্যবসা। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদও নাকি পাচার করেন, বৈধ রপ্তানি পণ্যের কন্টেনার ভরে। আসেও বহু আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য। এসব খাতে বিপুল অর্থ তিনি বিদেশে পাচার করেন বলে অভিযোগ আছে। কেউ ঘাঁটাতে সাহস পায় না, মিডিয়া মোগলের প্রভাব ও সরকারি দলে সংযুক্ত থাকায়। মা’ও নানা সামাজিক সংস্থায় যুক্ত।

আধা রাজনীতিক হলেও ইভার বাবা পাহলভি সাহেব রাজনৈতিক অফিস গড়েছেন আলাদা বাড়িতে। সেখানে অসংখ্য নেতা-কর্মীর ভিড়। নানান ধান্দাও। করোনাকালেও! এই বাড়িতে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বড় নেতা ছাড়া সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। এমনিতে পাঁচতারা হোটেলেই ইভাদের জন্মদিন উদযাপিত হয়। গত বছরও ইভার অমতে রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে জন্মদিন উদযাপন হয়।

বারবার এমন হওয়ায় খুব মন খারাপ ইভার। দাদুর সাথে গল্প করে একটু হাল্কা হয়। এমনিতেই ক্লাস চলছে অনলাইনে। বন্ধুদের সাথেও সাইবার যোগাযোগ ছাড়া সরাসরি দেখা নেই। বাগান, সুইমিংপুল আর মাঝে মাঝে লং ড্রাইভে চক্কর দিয়ে আসা। অনলাইন জীবনের বাইরে এভাবেই অনেক দিন চলছে।

তো, জন্মদিনে বাবা-মা’র ১৫, বড় ভাই-বোনের ১০, ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ইভার ১০, পারিবারিক ৬ আত্মীয় মিলে মোট অতিথি ৪১ জন। সুইমিং পুলকে ঘিরে মূল অনুষ্ঠান বসে। বেশ আড়ম্বরপূর্ণ। ইভার স্কুলবন্ধু ছাড়া সব অতিথি হাই প্রোফাইলের। গাড়ি এসেছে ৩০ এর বেশি। সবগুলো ভিতরে রাখা গেছে। ব্যক্তিগত দূরত্ব রেখে ৫টায় শুরু হওয়া সেলিব্রেশন, কেককাটা, আনন্দ আয়োজন শেষ হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। পুল সাইডে বার, সফট ড্রিংকস ও স্ন্যাকসের বুথ বসানো হয়। ঝুলানো হয়েছে আস্ত ভেড়ার গ্রিলড রোষ্ট। কাঁটায়-কাঁটায় ৮টায় ডিনার। ডাইনিং হলের সেন্টার টেবিলটি ওভাল শেপের। ২০ বাই ১৫ সাইজে ৩০০ স্কয়ার ফিটের। একসাথে ৪০ জন খেতে পারে। ১০০ স্কয়ার ফিটের আরো দুটো ডাইনিং-এ ১৬ জন করে ৩২ জনের ব্যবস্থাও আছে।

ডিনারটা বুফে। তবুও করোনার ভয়াল ডেল্টা প্লাস খুনী ভ্যারিয়েন্টের ভয় সবার মনে গেঁথে আছে। প্রচণ্ড ভয় হাঁচি-কাঁশিরও। এক হাঁচিতে কয়েক কোটি ভাইরাস ছড়ায় অনেক দূর। তাই ব্যক্তিগত দূরত্বের কড়াকড়ি কঠিনভাবে মেনে পিপিইসহ সুরক্ষাধারী ক্যাটারার তিন টেবিলে সবার বসার ব্যবস্থাও রেখেছে। এমনিতেই ছুটা-ছাটা আরো প্রচুর বসার আসন হলে। সব আয়োজনের দায়িত্ব পারিবারিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির। নগরীর নামি ও অভিজাত প্রতিষ্ঠান এটি। খাবারের মেনু, ব্যবস্থাপনা, অন্দরসজ্জা- সবকিছুই নিখুঁত ও পরিপাটি। বুফে ডিনার, দেশি-বিদেশি প্রচুর মুখরোচক আইটেম। ক্যাটারারের লোকজন দূরত্ব মেনে অতিথিদের সেবা দিচ্ছেন। পছন্দমতো খাবার তুলে নিচ্ছেন সবাই। মাস্ক নামিয়ে খাওয়া দাওয়া শুরু হয়েছে। চারপাশে ভুরভুরে সৌরভ মৌ মৌ করছে।

হঠাৎ বড় টেবিলের মাঝখানে আলো আঁধারিতে বিশাল ঘাঁই- ‘হ্যাঁচ্ছো! হ্যাঁচ্ছো! হ্যাঁচ্ছো-ওওও---!’ চলছেতো চলছে-বন্ধই হয় না! একেকটা ব্লাস্টের শব্দমাপ ৩০০ ডেসিবলের উপরে! গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ ঠাঁই পাবে নিশ্চিত!

প্রথম বিস্ফোরণের পরপরই খাবারের থালা ফেলে অতিথিরা তুমুল লাফঝাপ শুরু করেন। কে কার ঘাড়ে পড়ে হুঁশ নেই। ত্রিশ সেকেন্ডের মাঝে বিশাল ডাইনিং হল খালি। বাইরে গাড়ির হেডলাইটের গেট টার্গেট করে ছুটাছুটি! সাউন্ডপ্রুফ ভারী টিনটেট গ্লাসের দেয়ালঘেরা ডাইনিং হলের সেন্টার টেবিলে তখনো মুখ থুবড়ে বসে আছেন ইভার বুড়ো দাদু। তিনি থেমে থেমে ‘হ্যাঁচ্ছো’র মেসিনও চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রচুর খাদেম থাকলেও তাকে উদ্ধারে কেউ নেই বাড়িতে!

এদিকে পার্টি ভেঙে যাওয়ায় গুলি খাওয়া বাঘের মতো রাগে গড়গড় করছেন, ‘হ্যাঁচ্ছো’র কর্পোরেট কাম রাজনীতিক তারকা সন্তানপ্রবর! পাহলভির মুখ বিবর থেকে জনকের প্রতি এমন সব শব্দ লহরির ব্রাশ বা ওংকার ছিটকাচ্ছে, যা পাড়া বিশেষের কথ্য ভাষা হিসেবে বহুল প্রচলিত। শুনে ইভার মা প্রচণ্ড মেজাজ খারাপের মাঝেও খানিক তৃপ্তি নিয়ে সন্তান ও পিতৃ পরিবারের আপনদের নিয়ে দ্রুততম সময়ে নিরাপদ রুমে সরে যান।

মোস্তফা কামাল পাশা, গল্পকার ও সিনিয়র সাংবাদিক

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত